logo
Advertisement

দেশে ১০ ভাগ মানুষের হাতে ৯০ ভাগের চেয়ে বেশি সম্পদ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
দেশে ১০ ভাগ মানুষের হাতে ৯০ ভাগের চেয়ে বেশি সম্পদ
প্রতীকী ছবি

কোটি মানুষের শ্রমে-ঘামে ঘুরছে অর্থনীতির চাকা। অথচ সেই অর্জনের সিংহভাগ জমা হচ্ছে গুটিকয়েক মানুষের হাতে। সব মিলিয়ে চরম আয় বৈষম্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। দেশে ১০ ভাগ মানুষের হাতে ৯০ ভাগের চেয়ে বেশি সম্পদ জমা হচ্ছে। ফলে সমাজে বাড়ছে বৈষম্য।

Advertisement

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শীর্ষ ১০ শতাংশের আয় সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষের সামষ্টিক আয়ের ৩ দশমিক ১৮ গুণ বেশি। গত চার দশকে দেশে ক্রমাগতভাবে আয়বৈষম্য পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। কেননা ওপরে থাকা মানুষের আয় যে হারে বেড়েছে, এর চেয়ে অনেক বেশি হারে কমেছে নিচের দিকে থাকা মানুষের আয়। অন্যদিকে দেশে বাড়ছে দারিদ্র্যের হার। ফলে একসময়ের সাফল্যের গল্প এখন মলিন হয়ে যাচ্ছে। চরম দারিদ্র্যঝুঁকিতে মধ্যবিত্ত মানুষরা।

এমন প্রেক্ষাপটে আগামী দিনে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। পঞ্চবার্ষিক স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্কে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এটি তৈরি করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। চলতি অর্থবছর থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত যা বাস্তবায়নের লক্ষ্য।

ফ্রেমওয়ার্কে জিইডি বলছে, জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। ফলে জনাকীর্ণ বসতি, অপর্যাপ্ত আবাসন, অপ্রতুল সরকারি পরিষেবা এবং ক্রমবর্ধমান নগরবৈষম্য দেখা দিচ্ছে। অনেক নগরকর্মী সামাজিক সুরক্ষা বা কর্মসংস্থান সুরক্ষা ছাড়াই অনানুষ্ঠানিক ও স্বল্প বেতনের পেশায় নিযুক্ত থাকেন, যা তাদের মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং অর্থনৈতিক মন্দার মুখে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

আরও বলা হয়েছে, ১৯৮৩-৮৪ সালে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ মানুষের সম্মিলিত আয়ের প্রায় দেড় গুণ। ২০২২ সাল নাগাদ, এই অনুপাত দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৩ দশমিক ১৮-এ পৌঁছেছিল, যা ছিল এর সর্বোচ্চ পর্যায়। এ সময়ে সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের অংশ তীব্রভাবে কমে যায়। অন্যদিকে শীর্ষ ১০ শতাংশের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে মোট আয়ের ৪০ শতাংশেরও বেশি হয়েছিল। যদিও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু এর সুবিধাগুলো অসমভাবে বণ্টিত হওয়ায় সুফল মেলেনি। যার বেশিরভাগ সুবিধা উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীগুলোই ভোগ করেছে। বৈষম্য ক্রমবর্ধমানভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে প্রভাবিত করেছে, যাদের আয়ের অংশ ২০২২ সালে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল।

জিইডি বলছে, বৈষম্যের সঙ্গে দরিদ্রতার সম্পর্ক গভীর। বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে, দারিদ্র্য ও বৈষম্য এখনো অন্যতম প্রধান উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সূচকের উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে তুলনামূলকভাবে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। লাখ লাখ মানুষ মুক্তি পেয়েছে চরম দারিদ্র্য থেকে। এই হার ১৯৯১-৯২ সালের ৪১ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে গড় আয়ু প্রায় ৫০ বছর থেকে বেড়ে ৭৩ বছর হয়েছে। কমেছে শিশুমৃত্যুও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশে দারিদ্র্যের প্রকৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে।

দারিদ্র্য ক্রমবর্ধমানভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, কর্মসংস্থান নিরাপত্তা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতার সঙ্গে সম্পর্কিত বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রতিফলিত করে। অনেক পরিবার যারা নামমাত্র দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছে, তারাও অর্থনৈতিক ধাক্কা, অসুস্থতা, জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগ বা আকস্মিক আয় কমার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে মাঝারি দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে এবং একই সময়ে চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ফ্রেমওয়ার্কে জিইডি বলেছে, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং ঝুঁকির ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মডেলের অন্তর্ভুক্তিমূলকতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্য জাতীয় আয় তৈরি করেছে, তবুও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মজুরি বৃদ্ধি, শ্রম উৎপাদনশীলতা, সরকারি ব্যয়ের গুণমান এবং সুযোগের ন্যায়সংগত প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

আগামী পাঁচ বছরে বৈষম্য কমিয়ে দরিদ্রতা নিরসনে নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে ফ্রেমওয়ার্কে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বণ্টনগত প্রভাব উন্নত করা, প্রবৃদ্ধি-কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রকৃত আয় বৃদ্ধির মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং শ্রমবাজার সংস্কার।

এ ছাড়া খাতভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যবস্থাপনা করতে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের জন্য সহায়তা, অল্প সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য অবস্থার মূল্যায়ন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কাজের মান-মজুরি ও কর্মপরিবেশ উন্নত করা হবে।

আরও আছে— আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, খাতভিত্তিক রূপান্তরে সহায়তা, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরপত্তা কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং বাজেট বরাদ্দে অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ।

সূত্র: আগামীর সময়