২৫ বছরে পেট্রোল-অকটেনের দাম: কোন সময়ে কতটা বেড়েছে

পেট্রোল ও অকটেনের দাম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়— কোন সরকারের সময়ে লিটারপ্রতি কত টাকা বেড়েছে। তবে শুধু এই হিসাব দিয়ে গত ২৫ বছরের জ্বালানি মূল্যনীতির পূর্ণাঙ্গ তুলনা করা যায় না। দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার দাম থেকে শুরু করে পরবর্তী মূল্য সমন্বয়ের সংখ্যা, দাম অপরিবর্তিত থাকার সময়কাল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলেই পাওয়া যায় দেশের জ্বালানি তেলের দামের পরিবর্তনের তুলনামূলক চিত্র।
২০০১ সালের অক্টোবরে দেশে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ছিল ২৩ টাকা এবং অকটেন ২৫ টাকা। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৩ ও ৩৫ টাকা। ২০০৫ সালের মে মাসে পেট্রোল ও অকটেনের দাম ছিল ৩৫ টাকা করে। এরপর ২০০৬ সালের শুরুতে পেট্রোলের দাম ৫৬ টাকা এবং অকটেন ৫৮ টাকায় পৌঁছায়।
অর্থাৎ ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৬ সালের শুরু পর্যন্ত পেট্রোলের দাম ২৩ টাকা থেকে বেড়ে ৫৬ টাকা হয়। ৩৩ টাকা বৃদ্ধির হার প্রায় ১৪৩ শতাংশ। একই সময়ে অকটেনের দাম ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ টাকা হয়— বৃদ্ধি ৩৩ টাকা বা প্রায় ১৩২ শতাংশ।
২০০৮ সালে সর্বোচ্চ অস্থিরতা
পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। ২০০৮ সালের জুলাইয়ে দেশের বাজারে পেট্রোলের দাম ৮৭ টাকা এবং অকটেন ৯০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে দেশের বাজারেও মূল্য কমানো হয়। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে পেট্রোলের দাম নেমে আসে ৭৪ টাকা এবং অকটেন ৭৭ টাকায়।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এই দুই জ্বালানির দাম ছিল যথাক্রমে ৭৪ ও ৭৭ টাকা। পরবর্তী কয়েক বছরে বিভিন্ন দফায় মূল্য সমন্বয় হয়েছে। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের সময় পেট্রোলের দাম ৯৬ টাকা এবং অকটেনের দাম ৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের এপ্রিলে তা কমিয়ে পেট্রোল ৮৬ টাকা ও অকটেন ৮৯ টাকা করা হয়।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্থিতি। ২০১৬ সালের এপ্রিলের পর পেট্রোল ৮৬ টাকা এবং অকটেন ৮৯ টাকায় বিক্রি হয়েছে প্রায় ছয় বছর। ২০২২ সালের আগস্টে বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়ের আগ পর্যন্ত এই দর বহাল ছিল।
২০২২ সালে বড় সমন্বয়
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়। এর প্রভাবে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। ওই বছরের ৫ আগস্ট রাতে পেট্রোলের দাম ৮৬ টাকা থেকে এক লাফে ১৩০ টাকা এবং অকটেন ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়। অর্থাৎ একবারে পেট্রোলে ৪৪ টাকা এবং অকটেনে ৪৬ টাকা বৃদ্ধি পায়।
তবে ওই দর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ২৯ আগস্ট পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা করে কমিয়ে যথাক্রমে ১২৫ ও ১৩০ টাকা করা হয়।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণের যুগ
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নিয়মিত সমন্বয়ের কাঠামো চালু করা হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নোটিশগুলোতেও এ সময় থেকে বিভিন্ন দফায় মূল্য কাঠামো পুনর্নির্ধারণ ও সমন্বয়ের তথ্য পাওয়া যায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেট্রোলের দাম ছিল ১২৭ টাকা এবং অকটেন ১৩১ টাকা। ২০০৯ সালের জানুয়ারির ৭৪ টাকা থেকে এই সময়ের ১২৭ টাকা পর্যন্ত পেট্রোলের দাম বেড়েছে ৫৩ টাকা বা প্রায় ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে অকটেন ৭৭ টাকা থেকে ১৩১ টাকায় বেড়ে ৫৪ টাকা বা প্রায় ৭০ দশমিক ১ শতাংশ বেশি হয়েছে।
তবে এ দীর্ঘ সময়ের হিসাবের মধ্যে ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পেট্রোল ও অকটেনের দাম দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় আসে। ২০১৬ সালের নির্ধারিত ৮৬ ও ৮৯ টাকা ২০২২ সালের বড় সমন্বয়ের আগ পর্যন্ত বহাল ছিল।
২০২৬ সালে কয়েক দফা পরিবর্তন
২০২৬ সালে জ্বালানি তেলের দাম আবার কয়েক দফায় পরিবর্তিত হয়েছে। বছরের শুরুতে ফেব্রুয়ারিতে পেট্রোলের দাম ছিল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা। এরপর এপ্রিল মাসে পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা করা হয়। মে মাসের শেষেও জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্নির্ধারণের সরকারি নোটিশ জারি হয়।
এরপর সেপ্টেম্বরের শুরুতে পেট্রোলের দাম ছিল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়ে পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা করা হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নতুন দর ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে।
ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২১ সেপ্টেম্বর পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি ৪৪ টাকা বা প্রায় ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে অকটেন ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে— বৃদ্ধি ৪৫ টাকা বা প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
২৫ বছরের হিসাব
বিভিন্ন সময়ের দাম পাশাপাশি রাখলে চিত্রটি এমন—
| সময় | পেট্রোল | অকটেন |
|---|---|---|
| ২০০১ সালের অক্টোবর | ২৩ টাকা | ২৫ টাকা |
| ২০০৬ সালের শুরু | ৫৬ টাকা | ৫৮ টাকা |
| ২০০৯ সালের জানুয়ারি | ৭৪ টাকা | ৭৭ টাকা |
| ২০১৬ সালের এপ্রিল | ৮৬ টাকা | ৮৯ টাকা |
| ২০২২ সালের আগস্ট | ১৩০ টাকা | ১৩৫ টাকা |
| ২০২৪ সালের জুলাই | ১২৭ টাকা | ১৩১ টাকা |
| ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি | ১১৬ টাকা | ১২০ টাকা |
| ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬০ টাকা | ১৬৫ টাকা |
এই ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পেট্রোলের দাম ২৩ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ১৩৭ টাকা বা প্রায় ৫৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে অকটেনের দাম ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬৫ টাকা হয়েছে— বৃদ্ধি ১৪০ টাকা বা প্রায় ৫৬০ শতাংশ।
তবে দীর্ঘ সময়ের মূল্য পরিবর্তনকে শুধু শুরু ও শেষের দামের ব্যবধান দিয়ে বিচার করলে মাঝের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো বাদ পড়ে যায়। ২০০৮ সালের আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, ২০১৬ সালের মূল্যহ্রাসের পর কয়েক বছর দাম স্থিতিশীল থাকা, ২০২২ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং ২০২৪ সালের পর স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের কাঠামো— প্রতিটি পর্যায়েই মূল্য নির্ধারণের প্রেক্ষাপট আলাদা ছিল।
২০২৬ সালের সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সরকার। ২১ সেপ্টেম্বরের নতুন দরে পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা হয়েছে।
ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি মূল্যনীতির ২৫ বছরের চিত্র বুঝতে শুধু ‘কোন সরকারের সময়ে কত টাকা বেড়েছে’ এই একটি হিসাব যথেষ্ট নয়। মূল্য কত থেকে কত হয়েছে, কত সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তন হয়েছে, মাঝখানে কতদিন দাম অপরিবর্তিত ছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে তখন কী পরিস্থিতি ছিল এবং মূল্য সমন্বয়ের পদ্ধতি কী ছিল— এসব তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলেই তুলনাটি পূর্ণাঙ্গ হয়।


