জ্বালানি সংকট সাময়িক নয়, সামনে বড় ঝুঁকি আসতে পারে: হোসেন জিল্লুর

দেশের জ্বালানি সংকটকে সাময়িক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি মধ্যমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। সমস্যার সমাধান না হলে আবারও এই সংকট তৈরির শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।
শনিবার (২ মে) পিপিআরসি আয়োজিত ‘জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি’ শীর্ষক ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে তিনি এই শঙ্কা প্রকাশ করেন। এই আলোচনায় জ্বালানি, শিল্প ও কৃষি খাতের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সংকটের সূত্র ধরেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নিতে হবে। এ সংকটকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। তবে, অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে তা মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমস্যার মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থাকলে এই সংকট আবারও ফিরে আসবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের কৌশল পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে তেলের মজুত বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে। সে জন্য পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ বাড়াতে হবে।
সংকটের সময় ভোক্তাদের আচরণও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, আতঙ্ক থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করার প্রবণতা সংকটকে তীব্র করেছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিকবার তেল কিনেছেন।
তিনি জানান, সরবরাহ কমে গেলে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এখন সরবরাহ ও দাম উভয়ই বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতা কমে গেছে।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খোদা বকশ চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সংকটে মানুষ অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে এই সহনশীলতা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব ব্যাখ্যা করে ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ জানান, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন জ্বালানি সরবরাহকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। তাই ঝুঁকি মোকাবেলায় সমন্বিত ও বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল বলেন, কৃষি যন্ত্রনির্ভর হওয়ার ফলে জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। মাঠপর্যায়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা, ডলার সংকট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন সরাসরি দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নির্ভরতা কমাতে না পারলে সংকটের চক্র ভাঙা কঠিন।