logo

ঈদের পর খাদ্যপণ্য ও পরিবহনে তৈরি হতে পারে অস্থিরতা

ঈদের পর খাদ্যপণ্য ও পরিবহনে তৈরি হতে পারে অস্থিরতা

পরমাণু ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলাকালে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হঠাৎ যৌথ হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হন। এরপর বদলা নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইরান। তেহরান প্রতিশোধ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো শুরু করে।

পাল্টা হামলাতেই ক্ষান্ত হয়নি ইরান। দেশটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্ববাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত জ্বালানি রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা শুরু হয়, যার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে যাচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি কী, কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি। এটি পারস্য উপসাগরে যাওয়ার একমাত্র সামুদ্রিক প্রবেশপথ। এর এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত। এসব দেশ তাদের জ্বালানি সরবরাহে এই পথের ওপর নির্ভরশীল।

হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ভৌগোলিকভাবে এটি পারস্য উপসাগরকে সরাসরি ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এবং সেই পথ ধরে জাহাজগুলো আরব সাগরে তথা ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এ ছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২৫ শতাংশ পরিবাহিত হয়। কিন্তু ইরানে হামলার জেরে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই পথ দিয়ে জাহাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এরপরও কোনো জাহাজ এটি পার হওয়ার চেষ্টা করলে পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে দেশটি। ইতোমধ্যে শত শত তেলের ট্যাংকার আটকা পড়েছে।

আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল সংস্থাগুলো জানিয়েছে, গত তিন দিনে এই রুটে ৮০ শতাংশের বেশি জাহাজ চলাচল হ্রাস পেয়েছে।

হু হু করে বাড়ছে তেলের দাম

বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম পথ ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হামলার পর কাতার তাদের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। এ ছাড়া ইরানের ড্রোন হামলার পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো তাদের সবচেয়ে বড় শোধনাগার রাস তানুরা সতর্কতার অংশ হিসেবে বন্ধ করে দিয়েছে। এমন অবস্থায় বিশ্বব্যাপী তৃতীয় দিনের মতো বেড়েছে তেলের দাম।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) দুপুরে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় এক দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল-প্রতি ৭৯ দশমিক ২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ থাকলে এটি ব্যারেল-প্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন করা তেলের দাম প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

এ ছাড়া বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক ‘কাতার এনার্জি’ তাদের স্থাপনাগুলোতে হামলার পর উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়ে যায়। ইউরোপের বাজারে গ্যাসের দাম এক দিনেই বেড়েছে ৩৫ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশে কত দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে ১৪ দিনের ডিজেল, ২৮ দিনের অকটেন, ১৫ দিনের পেট্রোল, ৯৩ দিনের ফার্নেস এবং ৫৫ দিনের জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে রেখে তেলের বিকল্প বাজার খোঁজার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে, তাতে দাম বাড়ার শঙ্কা নেই। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে গতকাল পর্যন্ত সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে ১৪ দিন পর জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে কীভাবে চাহিদা পূরণ করা হবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি।

সবকিছুর দাম বাড়ার শঙ্কা

হরমুজ প্রণালি যদি এক মাস পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি মোকাবিল বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হবে, যা রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে এবং স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে।

তেলের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ শিপিং খরচ বাড়বে, যা বাস, ট্রাক ও বিমানের ভাড়া বাড়িয়ে দেবে। শুধু তা-ই নয়, ইতোমধ্যে আমদানিনির্ভর খাদ্যশস্য, ভোজ্য তেল ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা পরোক্ষভাবে প্রতিটি শিল্পপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান এই সংঘাতের ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি স্থায়ী এবং সরবরাহে সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশেও ঘাটতি তৈরি হতে পারে, দাম বেড়ে যেতে পারে সবকিছুর।

মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তেহরানের কঠোর অবস্থান এবং বাহরাইন-জর্ডান থেকে মার্কিন কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়ার পর যুদ্ধের উত্তেজনা কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তবে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বড় মন্দা অনিবার্য। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা মানেই হচ্ছে বিশ্ববাজারের সরবরাহ চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়া। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি।

তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহে ঝুঁকি বৃদ্ধি স্বল্প উন্নত দেশগুলোকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশে ১৪ দিনের জ্বালানির মজুতের কথা বলা হচ্ছে। এরপর কী হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলা হচ্ছে না। ঈদের পর পরিবহন ও খাদ্যশস্যের দাম বাড়তে পারে।

জাকির হোসেন আরও বলেন, সরকার জ্বালানি আমদানির বিকল্প দেশ খুঁজতেছে বলে মনে হয় না। তারা বসে আছে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সমাধানের। কিন্তু ১৪ থেকে ১৫ দিন পর ডিজেল ও পেট্রোলের চাহিদা কীভাবে পূরণ করা হবে, সেটি নিয়ে তাদের চিন্তা দেখছি না। সরকারকে অবিলম্বে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।