ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের টাকা ফেরতের অপেক্ষায় লাখো গ্রাহক

ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাখ লাখ গ্রাহকের আমানতের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম এবং সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হেমায়েত উল্লাহসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বর্তমানে নজরুল ও হেমায়েত গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
এ দিকে বিমা দাবির টাকা না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন লাখ লাখ ক্ষুদ্র আমানতকারী। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমানতারীরা রাজধানীর তোপখানা রোডের প্রধান অফিসে এসে তাদের বিমা দাবির অর্থের জন্য তাগাদা দিচ্ছেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এরকম কয়েকজন ক্ষুদ্র আমানতকারী ফারইস্টের প্রধান কার্যালয়ে আসেন। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে আমানত ফেরত দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেন।
ময়মনসিংহ থেকে আসা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহক নাজনিন আক্তার বলেন, ‘আমি অনেক কষ্টে টাকা জমিয়েছি, পাঁচ বছর ধরে টাকা পাচ্ছি না। নজরুল-হেমায়েতরা টাকা নিয়া গেছে। আমার স্বামী নেই, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। আমি আমার টাকা ফেরত চাই। আর নজরুল-হেমায়েতেরও বিচার চাই।’
এ রকম লাখ লাখ গ্রাহক আছেন যারা ডিম বিক্রি করে, মুরগি বিক্রি করে, দিনমজুরি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় থেকে অল্প অল্প করে সঞ্চয় করেছিলেন। সেই সঞ্চয় ছিল নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিমা দাবি না পাওয়ায় সেই ক্ষুদ্র আমানতকারীরাই রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। তাদের অনেকের কাছে বিমার টাকা শুধু একটি আর্থিক বিনিয়োগ নয়; এটি সন্তানের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা কিংবা অবসর জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত।
৮১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ফারইস্ট ইসলামী লাইফের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৮১৬ কোটি ২৯ লাখ ৭২ হাজার ৪৪০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন কোম্পানির আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন। মামলায় সাবেক পরিচালক এম এ খালেক, নজরুল ইসলামসহ একাধিক সাবেক কর্মকর্তা ও পরিচালকের নাম আসে।
পরবর্তীতে মামলাটির তদন্তভার ডিবির কাছে যায়। তদন্ত শেষে ডিবি ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ৬৪৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নজরুল ইসলাম, সাবেক সিইও মো. হেমায়েত উল্যাহসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে ভুয়া চিঠি ও ভাউচার তৈরি, তথ্য গোপন এবং কোম্পানির বিনিয়োগ করা অর্থ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে ৩৬ তোপখানা রোডের জমি ও ভবন কেনার ক্ষেত্রে ৪৫ কোটি টাকা এবং ৭২ কাকরাইলের জমি ও ভবন কেনার ক্ষেত্রে ১১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। মিরপুরের গোড়ান চটবাড়ি এলাকার জমির উন্নয়ন ব্যয় দেখিয়ে ৯২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারাগারে নজরুল-হেমায়েত
৮১৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলায় ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেছিলেন নজরুল ইসলাম। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
অন্যদিকে, সাবেক এমডি হেমায়েত উল্যাহকেও সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি আদালত দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে একটি দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। ওই আবেদনে বলা হয়, তিনি ফারইস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে তোপখানা রোডের জমি ও ভবন ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত ছিলেন।
নজরুল ইসলাম ও হেমায়েত উল্যাহ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
নজরুলের সম্পদ ক্রোকের আদেশ
ফারইস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু একটি মামলা নয়, দুদকের একাধিক মামলাও রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর আদালত নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের নামে থাকা ৫৭ কোটি ৬১ লাখ ৬৭ হাজার টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দেন।
এর আগে দুদকের আবেদনে বলা হয়েছিল, এসব সম্পদ হস্তান্তর বা পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরও আগে তোপখানা রোডের একটি জমি ও স্থাপনা কেনাবেচায় অনিয়মের মাধ্যমে ফারইস্টের ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নজরুল ইসলামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করে। ওই মামলায় নজরুলকে গ্রেপ্তারের পর আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
