logo
Advertisement

কুবিতে সংঘর্ষে দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার, ছাত্রদল কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কুবি
কুবিতে সংঘর্ষে দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার, ছাত্রদল কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন
কুবিতে কাজী নজরুল ইসলাম হলে প্রশাসনের সামনে হওয়া সংঘর্ষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কাজী নজরুল ইসলাম হলের দেওয়ালে ‘JCD’ লেখাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনার মীমাংসা করতে গিয়ে আবারও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দুই শিক্ষার্থীকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হলেও সংঘর্ষে জড়িত ছাত্রদলের কর্মীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

শুক্রবার (২১ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে কাজী নজরুল ইসলাম হলে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য, হল প্রশাসন ও কর্তব্যরত সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বহিষ্কৃত দুই শিক্ষার্থী হলেন অর্থনীতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ইলিয়াস ইসলাম শুভ ও হুমায়ূন কবীর। অভিযুক্ত ছাত্রদল কর্মীরা হলেন ইংরেজি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের মারুফ হোসাইন ও শনব দেবনাথ এবং মার্কেটিং বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের সাদেক সাকের।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের ঘটনার সমাধানের চেষ্টা করছিল হল প্রশাসন। একপর্যায়ে সাংবাদিকসহ উপস্থিত অন্যদের সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়। বের হওয়ার পথে বহিষ্কৃত দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মীর ধস্তাধস্তি ও মারামারি শুরু হয়।

ভিডিও ফুটেজে শনব দেবনাথকে সিগারেট মুখে নিয়ে ইলিয়াস শুভকে আঘাত করতে দেখা যায়। এ সময় সাদেক সাকের শুভকে গলা জড়িয়ে ধরে রাখে এবং মারুফ হোসাইনকে শুভর ওপরে আঘাত করতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা মারুফকে সরিয়ে নিলে তিনি হুমায়ূন কবীরের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে ভিডিও ফুটেজে মারুফের মুখে রক্ত দেখা যায়।

কুবিতে প্রশাসনের সামনে হওয়া সংঘর্ষে মারুফ হোসাইন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কুবিতে প্রশাসনের সামনে হওয়া সংঘর্ষে মারুফ হোসাইন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এ ঘটনায় ইলিয়াস ইসলাম শুভ ও হুমায়ূন কবীর সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদল কর্মী মারুফ হোসাইন ও শনব দেবনাথ এবং সাদেক সাকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।

আহত মারুফ হোসাইন বলেন, আমি মেডিকেলে আছি। আমার মাথায় আঘাত লেগেছে এবং দুইটা সেলাই দেওয়া হয়েছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এখন মেডিকেলে আছি, আমি পরে কথা বলব। অভিযুক্ত শনব দেবনাথের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে ইলিয়াস ইসলাম শুভ বলেন, প্রথমে মারুফ এসে হুমায়ূনকে ধাক্কা দেয়। এরপর হুমায়ূন ও মারুফের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে আমি থামাতে যাই। তখন আমাকে মারধর করা হয়। সাদেক আমাকে ধরে রেখেছিল। এরপর শনব ও মারুফ আমার মাথায় আঘাত করে। আমার মাথা ফুলে গেছে। হাতে ফ্র্যাকচার হয়েছে কিনা, পরীক্ষা করাব। আমার হাতে কিছুই ছিল না। এমনকি আংটিও ছিল না। আমার চশমাও ভেঙে গেছে।

কুবিতে প্রশাসনের সামনে হওয়া সংঘর্ষে শনব দেবনাথ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কুবিতে প্রশাসনের সামনে হওয়া সংঘর্ষে শনব দেবনাথ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

হুমায়ূন কবীর বলেন, প্রভোস্টের রুমেই শনব ও মারুফ অনেক অ্যাগ্রেসিভ ছিল। সেখানে মারুফ আমাকে একবার ধাক্কা দেয়। বাইরে এসে সে আমাকে আবার আঘাত করে। এরপর আমিও তাকে ধাক্কা দিই। এর মধ্যে হাতাহাতি হয়। আমাকে তিন-চারজন ধরে রেখেছিল। সে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। মারামারির মধ্যে কীভাবে তার মাথা ফেটেছে, আমি জানি না।

এদিকে, হল থেকে বহিষ্কারের পর ইলিয়াস শুভ ও হুমায়ূন কবীরের বিছানাপত্রসহ অন্যান্য সরঞ্জাম বাইরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শনব দেবনাথ, সাদেক সাকের ও শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে পূর্বে বহিষ্কৃত রাফসান সামির বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে সাদেক সাকের বলেন, আমাদের ছোট ভাইকে মারছে, ওর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। যেহেতু আমরা সেখানে ছিলাম, আমার এলাকার ছোট ভাইকে মারছে, এজন্য আমরা এটা ফেলে দিয়েছি।

অভিযুক্ত রাফসান সামি এ বিষয়ে কোনো জবাব দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এটার ব্যাপারে আপনি প্রভোস্ট স্যারকে জিজ্ঞেস করেন। আমি কী করছি না করছি, এটা প্রভোস্ট জানবে।

দুই গ্রুপের মারামারিতে ছাত্রদল কর্মীদের কেন বহিষ্কার করা হয়নি এটা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সাজ্জাদ হোসেন সাহিব। তিনি বলেন, আমাদের প্রশ্ন হলো, সংঘর্ষে ছাত্রদলের কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি ভিডিও ফুটেজেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাহলে শুধু ইলিয়াস ও হুমায়ূনকে কেন সাময়িক বহিষ্কার করা হলো? ছাত্রদলের ওই তিন কর্মীর বিরুদ্ধে কেন কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যদি সত্যিই নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে চায়, তাহলে রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে সংঘর্ষে যার যতটুকু দায়, তার ভিত্তিতে সবার বিরুদ্ধেই সমান ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এক পক্ষকে বহিষ্কার করে আরেক পক্ষকে কোনো ব্যবস্থা না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।

হল প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত চলাকালীন ইলিয়াস ইসলাম শুভ ও হুমায়ূন কবীরকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। পরে তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে শহরের একটি মেসে দিয়ে আসা হয়। এ ঘটনায় তদন্তের জন্য হলের হাউস টিউটর মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. হারুন বলেন, প্রথম ঘটনার সুন্দর সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম। সমাধান হয়নি। দ্বিতীয় ঘটনাটি যেহেতু আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে, তাই আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত পরিচালনার জন্য তদন্ত চলাকালীন সময়ে তাদের দুজনকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। আমরা এখানে আঘাতের ডিগ্রি বিবেচনায় নিয়েছি। বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবেন।

তবে বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীদের বিছানাপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম বাইরে ফেলে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাধ্যক্ষ কোনো মন্তব্য না করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

দুই পক্ষের মারামারিতে এক পক্ষকে বহিষ্কার করা হলেও অন্য পক্ষকে কেন বহিষ্কার করা হয়নি এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. হারুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা এখানে আঘাতের ডিগ্রি বিবেচনায় নিয়েছি। যেহেতু মারুফ (ছাত্রদল কর্মী) আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে এবং তাকে আহত করার ব্যাপারটা বিপক্ষ গ্রুপের বিরুদ্ধে যাচ্ছে তাই তদন্তের সাপেক্ষে আমরা দুজনকে সাময়িক বহিষ্কার করেছি।

তিনি আরও বলেন, যখন দুজন ব্যক্তির সংঘর্ষে একজন নিহত হয় তখন নিহত ব্যক্তির বিচার হয় না বরং অপরজনের বিচার হয়। সে প্রেক্ষিতে আমরা অভিযুক্তদের বহিষ্কার করেছি এবং এখানে একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হয়নি।