logo
Advertisement

শাবিপ্রবিতে ৫৩ কোটির প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, শাবিপ্রবি
শাবিপ্রবিতে ৫৩ কোটির প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
নির্মাণাধীন প্রশাসনিক ভবন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) নির্মাণাধীন প্রশাসনিক ভবনের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট, অপ্রচলিত ব্র্যান্ডের রড ও মানহীন পাথর ব্যবহারের পাশাপাশি ঢালাইয়ের ওপর রড উন্মুক্ত থাকারও প্রমাণ মিলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২’-এর আওতায় ‘দেশ উন্নয়ন করপোরেশন’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনটি নির্মাণ করছে।

Advertisement

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের তথ্যমতে, উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দেশ উন্নয়ন করপোরেশন ৫৩ কোটি টাকার চুক্তিতে ১০ তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের কাজ করছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ৮৭ কোটি টাকার চুক্তিতে আরেকটি ১০ তলা বিশিষ্ট আবাসিক হল তৈরি করছে বলে জানিয়েছে প্রকৌশল দপ্তর।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের নির্মাণসামগ্রী রাখার স্থানে বেশ কিছু মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টের বস্তা মজুদ রাখা রয়েছে। এসব সিমেন্টের মেয়াদ গত বছরের এপ্রিল, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে গেছে। আবার কিছু সিমেন্টের মেয়াদ চলতি বছরের জানুয়ারিতে শেষ হয়ে গেছে। এ ছাড়া গত জুন মাসে মেয়াদ শেষ হওয়া সিমেন্টও নির্মাণকাজে ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

এছাড়া ঢালাই করা ছাদের কয়েকটি স্থানে পর্যাপ্ত কংক্রিট না দেওয়ায় ভেতরের রড বের হয়ে আছে। একই সঙ্গে এ কাজে নিম্নমানের পাথর ও বালু ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

চুক্তিপত্র অনুযায়ী ভবনের কাজ চলতি বছরের ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও গত ৯ আগস্ট পর্যন্ত এ ভবনের আনুমানিক মাত্র ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে কর্মরত সাইট ইঞ্জিনিয়ার।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এইচ. এম. এ মাহজুজ বলেন, কথা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহার করলে ঢালাইয়ে পর্যাপ্ত শক্তি পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া সিমেন্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে এটি অনেক সময় জমাট বেঁধে পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। ফলে সিমেন্ট ভালোভাবে মিশ্রিত হয় না এবং কংক্রিটের কাঙ্ক্ষিত গুণগত মান ও স্থায়িত্ব পাওয়া যায় না।

রডের বিষয়ে তিনি বলেন, ল্যাব টেস্টে যদি পিডব্লিউডি নির্ধারিত মান অনুযায়ী ৬০ কেএসআই (কিলোপাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি) হয়, তাহলে সেটি ব্যবহারে আপত্তি করার যৌক্তিক কারণ নেই। তবে আমরা সবসময় ভালো ব্র্যান্ডের ও প্রমাণিত মানসম্মত রড ব্যবহারেরই পরামর্শ দিয়ে থাকি।

পাথর ব্যবহারের বিষয়ে তিনি জানান, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাথরের গ্রেডেশন নির্ধারণে ছোট থেকে বড় বিভিন্ন সাইজের পাথর নির্দিষ্ট অনুপাতে থাকতে হয়। একই আকারের পাথর ব্যবহার করা সঠিক নিয়ম নয়। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাইজ ১৯ মিলিমিটার এবং সর্বনিম্ন সাইজ ১০ মিলিমিটার পর্যন্ত হওয়া উচিত।

ঢালাইয়ের পর ছাদে রড উন্মুক্ত থাকার বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ঢালাই দেওয়ার পর যদি রড বের হয়ে থাকে, তবে তা কাঠামোর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে রডে দ্রুত মরিচা ধরে যাবে। ফলে আশপাশের কংক্রিটে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে ফাটল দেখা দেবে। ছাদের ঢালাইয়ে রডের ওপর ন্যূনতম ০.৬ থেকে ০.৮ ইঞ্চি কংক্রিট কভার রাখা উচিত। আর কলাম ও বিমের ক্ষেত্রে সাধারণত ১.৫ থেকে ২ ইঞ্চি কংক্রিট কভার রাখা প্রয়োজন, যাতে রড সরাসরি বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসতে না পারে।

এসব অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ব্যবহারের প্রশ্নই আসে না। আপনারা ভুল বলছেন। আমরা রানিং লাফার্জ সিমেন্ট নিয়ে আসছি। পুরোনো সিমেন্ট আমরা নিচে রাখি, আর তার ওপরে নতুন সিমেন্ট এনে রাখি।

রডের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা পিডব্লিউডি লিস্টেড রড। তাই এটা আমরা ব্যবহার করতেই পারি। বাংলাদেশের কোনো ঠিকাদার আছে, যে বিএসআরএম বা কেএসআরএম রড ব্যবহার করে? আমার পক্ষে এত দামি রড ব্যবহার করা সম্ভব না।

ছাদে রড বের হয়ে থাকার বিষয়ে প্রজেক্ট ম্যানেজার বলেন, ছাদের মধ্যে তো রড বের হয়ে থাকার কথা না। হয়তো মিস্ত্রি খেয়াল করেনি, তাই রড বের হয়ে আছে। এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে আমাকে আপনারা হয়রানি করছেন।

এসব বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল আহমদ চৌধুরীকে মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি সাংবাদিকের পরিচয় পেয়েই কল কেটে দেন।

অন্যদিকে এ প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কর্মরত সাইট ইঞ্জিনিয়ার জয়নাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, বস্তায় সিমেন্টের মেয়াদ স্পষ্ট করে লেখা থাকে না। আর এখানে মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্টও ব্যবহার করা হয় না। আমরা চেষ্টা করি ভালো মানের রড ব্যবহার করতে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাড়তি লাভের জন্য প্রথম সারির ব্র্যান্ডের রড ব্যবহার করতে চায় না। এখানে আমার এক পার্সেন্টেরও কোনো ধরনের কমিশন নেই।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।