ক্ষতিকর রাসায়নিকের বিকল্প দেশের প্রথম ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ ছত্রাকনাশক উদ্ভাবন

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকদের ২৫ বছরের গবেষণার ফল হিসেবে দেশে প্রথমবারের মতো ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ নামে একটি জৈব ছত্রাকনাশক উদ্ভাবিত হয়েছে। দেশীয় উৎসের ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম ব্যবহার করে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এ বায়োফরমুলেশনটি ছত্রাকজনিত রোগ দমনের পাশাপাশি জৈব সার হিসেবেও কার্যকর। প্রতি গ্রাম পণ্যে অন্তত ২০ লাখ জীবন্ত ট্রাইকোডার্মা স্পোর রয়েছে। গবেষণা দলের দাবি, এটি ফসলের রোগ নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা উন্নয়ন এবং মৎস্য খাতে পানির গুণগত মান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব (প্ল্যান্ট প্যাথোলজি) বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে প্রধান গবেষক ও বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল উদ্ভাবিত ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ জৈব ছত্রাকনাশকের কার্যকারিতা ও গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কে. এম. মহিউদ্দিন, ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহেদ রেজা, গবেষণায় যুক্ত স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীসহ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জিল বলেন, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত মোট বালাইনাশকের প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশই রাসায়নিক ছত্রাকনাশক। এসব রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে শুধু ক্ষতিকর ছত্রাক নয়, মাটির উপকারী অণুজীব ও ছত্রাকও ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে মাটির স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ সমস্যা বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প হিসেবে ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা একই সঙ্গে জৈব ছত্রাকনাশক ও জৈব সার হিসেবে কার্যকর।
তিনি আরও জানান, গবেষণার শুরুতে দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মাটি ও রাইজোস্ফিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে শতাধিক ট্রাইকোডার্মা ছত্রাক আলাদা করে দীর্ঘদিন তাদের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। পরে সবচেয়ে কার্যকর, স্থিতিশীল এবং বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগী ট্রাইকোডার্মা অ্যাসপেরেলাম নির্বাচন করে এর ভিত্তিতে বায়োফরমুলেশন তৈরি করা হয়।
তার ভাষ্য, দেশীয় উৎসের অণুজীব ব্যবহার করে তৈরি হওয়ায় এ পণ্যটি আমদানিনির্ভর বায়োপণ্যের তুলনায় বেশি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে উৎপাদন করা সম্ভব হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্ভাবিত এ জৈব ছত্রাকনাশক বিভিন্ন ধরনের ফসলে কার্যকর ফল দিয়েছে। বিশেষ করে টমেটো, আলু, বেগুন, ঢেঁড়স, মরিচ, শশা, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজি, ডালজাতীয় ফসল, চা ও পান চাষে এর কার্যকারিতা মিলেছে। পরীক্ষায় এসব ফসলে ফিউজারিয়াম উইল্ট, রুট রট, স্ক্লেরোটিয়াম ব্লাইট এবং পাতার দাগ রোগ নিয়ন্ত্রণে ভালো ফল পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় এ জৈব ছত্রাকনাশক ব্যবহারে বিভিন্ন ফসলে উল্লেখযোগ্য ফলন বৃদ্ধি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে টমেটোতে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ, আলুতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ, ধানে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, গমে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং চা গাছে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বেড়েছে। এছাড়া মরিচ ও ডালজাতীয় ফসলে বীজবাহিত ছত্রাকজনিত রোগ ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।
কার্যকারিতা সম্পর্কে অধ্যাপক মঞ্জিল বলেন, ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ উদ্ভিদের শিকড়ের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায় এবং মাটির জৈবিক স্বাস্থ্য উন্নত করে। পাশাপাশি এটি রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে রোগ ও পোকামাকড় দমনেও সহায়তা করে। তার মতে, সহজে ব্যবহার করা যায় বলে প্রযুক্তিটি কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী ও ব্যবহারবান্ধব।
গবেষণা দলের মতে, ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ শুধু কৃষি নয়, ছাদকৃষি ও মৎস্য খাতেও ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। মৎস্য খাতে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহেদ রেজা বলেন, মাছচাষে অব্যবহৃত খাদ্য ও মাছের বর্জ্যের কারণে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। ট্রাইকোডার্মাভিত্তিক এ পণ্য ব্যবহারে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) বৃদ্ধি এবং অ্যামোনিয়ার মাত্রা কমতে দেখা গেছে, যা মাছের উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত প্রযুক্তিটি ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা হয়েছে। বড় পরিসরে প্রয়োগের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা আরও নিশ্চিতভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ শতভাগ জৈব ও নিরাপদ ছত্রাকনাশক। প্রচলিত রাসায়নিক ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফসল সংগ্রহ ও জমিতে প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকে। তবে এ পণ্য ব্যবহারে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, ট্যালকম পাউডারের সঙ্গে ট্রাইকোডার্মা ছত্রাক ব্যবহার করে এটি তৈরি করা হয়েছে। ফলে এতে কোনো ক্ষতিকর উপাদান নেই।
তিনি আরও জানান, দূষিত বা ভারী ধাতুসমৃদ্ধ মাটিতে এ পণ্য প্রয়োগ করলে উদ্ভিদের ভারী ধাতু শোষণ কমে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ে। এতে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। বর্তমানে দেশে রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার অনেক বেশি হলেও জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম। তাই ‘পিজি-ট্রাইকোডার্মা’ রাসায়নিক ছত্রাকনাশকের কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হতে পারে।
এ ছাড়া তিনি জানান, নার্সারি বেড ও মাটি শোধনের পাশাপাশি বীজের সঙ্গে মিশিয়ে কিংবা সরাসরি গাছে স্প্রে করেও এ পণ্য ব্যবহার করা যায়।
গবেষণা দলের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ভাবিত এ পণ্যটি বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্ধারিত মান যাচাই ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এ পরিবেশবান্ধব বায়ো-পণ্য কৃষকদের জন্য সহজলভ্য হবে। একই সঙ্গে এটি টেকসই কৃষি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
.png)






