ন্যানো যুগে কেমন আছে লাল ডাকবক্স

একসময় দূরে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল হাতে লেখা চিঠি। প্রিয় মানুষের একটি চিঠির অপেক্ষায় দিনের পর দিন কাটানো, বাড়ির সামনে ডাকপিয়নের আগমনের শব্দ শোনা কিংবা নিজের নামে একটি খাম হাতে পাওয়ার আনন্দ—এসব ছিল মানুষের জীবনের পরিচিত অনুভূতি। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে সেই চিত্র এখন অনেক বদলে গেছে।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব চিঠি দিবস। দিবসটি উপলক্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে যোগাযোগের বদলে যাওয়ার এক বাস্তব চিত্র। ব্যক্তিগত যোগাযোগে হাতে লেখা চিঠির জায়গা দখল করেছে নানা যোগাযোগমাধ্যম। তবে এই সুযোগের ভিড়ে কোথাও হারিয়ে গেছে অপেক্ষার সেই অনুভূতি, প্রিয় মানুষের হাতের লেখায় লুকিয়ে থাকা আবেগ এবং কাগজে জমে থাকা কিছু একান্ত ব্যক্তিগত কথা।
বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মাহাদী বলেন, একসময় রাস্তার পাশে থাকা ছোট্ট ডাকবাক্সই ছিল দূরে থাকা মানুষের কাছে নিজের কথা পৌঁছে দেওয়ার একমাত্র মাধ্যম। বাড়ির সামনে ডাকপিওন এসে কারও নাম ধরে ডাকছেন—এই দৃশ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত অপেক্ষা, আনন্দ, উৎকণ্ঠা ও কৌতূহল। দূরে থাকা সন্তান লিখত বাবা-মাকে, স্বামী লিখতেন স্ত্রীকে, বন্ধু বন্ধুকে লিখত। কেউ জানাত চাকরি পাওয়ার খবর, কেউ পরীক্ষার ফলাফল; আবার কেউ পরিবারের অভাব-অভিযোগের কথা। মুখে প্রকাশ করতে না পারা ভালোবাসার কথাও জায়গা করে নিত প্রেমপত্রের পাতায়।
সাদাকালো কিংবা রঙিন কাগজে লেখা সেই শব্দগুলোর মধ্যে থাকত মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও অনুভূতির গল্প। প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় অথচ প্রিয় কিছু কথা, কখনো ভালোবাসা। চিঠি ডাকবাক্সে ফেলে শুরু হতো আরেক অধ্যায়—অপেক্ষা।
তিনি আরও বলেন, চিঠি দিবস প্রযুক্তিকে অস্বীকার করতে আসেনি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বছরের একটা দিনে হলেও প্রিয়জনদের খুশি করা উচিত। মনের সুপ্ত কথাগুলো প্রকাশ করে মনকে মুক্ত করা উচিত।
তবে ডিজিটাল যুগেও যে চিঠির সংস্কৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তার প্রমাণ মেলে জাবির তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মারিয়া সুলতানা মিতুর অভিজ্ঞতায়। তার কাছে চিঠি কোনো বিশেষ দিবসের বিষয় নয়; বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ভালোবাসা ও অনুভূতি প্রকাশের একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস।
মারিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, চিঠি দিবস নিয়ে আমার আলাদা কোনো বিশেষ অভিব্যক্তি নেই। আসলে চিঠি আমার কাছে কোনো নির্দিষ্ট দিনের বিষয়ও না। ২০২২ সাল থেকে একজন মানুষ নিয়মিত আমাকে চিঠি লিখে আসছে, আমিও তার চিঠির প্রত্যুত্তর দিই। আমার কাছে বিষয়টা খুব সাধারণ, কিন্তু একই সঙ্গে বেশ ভালো লাগারও। এখনকার সময়ে এসেও নিয়মিত কারও জন্য বসে চিঠি লেখা, তারপর তার উত্তরের অপেক্ষা করা— এই ব্যাপারটার মধ্যেই এক ধরনের আলাদা অনুভূতি আছে। চিঠি দিবস বলে নয়, এই অভ্যাসটা এমনিতেই আমার কাছে ভালোবাসা প্রকাশের সুন্দর একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জুবাইর জিয়ান এশিয়া পোস্টকে জানান, লাল ডাকবক্সগুলো একসময় যে আবেদন বহন করতো, ন্যানো যুগে এসে তা মেট্রোপলিটন মন মননের সাথেই হারিয়ে গেছে। বক্সগুলো দেখলেই মনের মধ্যে একটা অনুভূতি জন্মায়। ন্যাক্রোপলিসের মৃত মানুষের ভিড়ে এখনও চাই কেউ সেই আগের স্পিরিটেই লিখুক আমাকে, আমাদের।


