logo

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩৪ নম্বর রুম থেকে জার্মানিতে দুই বন্ধু

রবিউল ইসলাম শাকিল, জাককানইবি
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩৪ নম্বর রুম থেকে জার্মানিতে দুই বন্ধু
দুই বন্ধু তাহমিদুর রহমান পাভেল ও মো. সোয়েব আহমেদ সাইমন। পূর্বের ও বর্তমান ছবি: তাদের ফেসবুক আইডি থেকে নেওয়া

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্রোহী হলের ৮৩৪ নম্বর কক্ষটি চার বছর ধরে ছিল তাহমিদুর রহমান পাভেল ও মো. সোয়েব আহমেদ সাইমনের ঠিকানা। ২০২২ সালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালে স্নাতক (সম্মান) শেষ করা পর্যন্ত একই কক্ষে থেকেছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই সহাবস্থানই একসময় তাদের সামনে একটি অভিন্ন লক্ষ্য তৈরি করে, উচ্চশিক্ষার জন্য একসঙ্গে জার্মানিতে যাওয়া।

দুজনের বিভাগ ছিল আলাদা। পাভেল ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের এবং সাইমন স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার ক্ষেত্র ভিন্ন হলেও বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনায় তারা শুরু থেকেই ছিলেন একাট্টা। প্রায় এক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় খোঁজা, ভর্তির শর্ত যাচাই, আবেদন প্রক্রিয়া এবং আইএলটিএস -এর প্রস্তুতি, সবই করেছেন একসঙ্গে।

বিশেষ করে, ভিন্ন বিভাগের হওয়ায় একই দেশে দুজনের উপযোগী বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। তাই এমন একটি দেশ নির্বাচন করা তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে, যেখানে দুজনই নিজ নিজ বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ পাবেন।

প্রস্তুতির বিষয়ে পাভেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেশের বাইরে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে আমরা প্রায় এক বছর নিজেরা প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে একই দেশে পড়তে যাওয়া। রাতের পর রাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শর্তাবলি যাচাই, সর্টিং করা এবং আইএলটিএস-এর প্রস্তুতি একসঙ্গেই নিয়েছি।

দীর্ঘ প্রস্তুতির পর জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান দুজনই। তবে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্ববিদ্যালয় সেশনের সময়সূচির কারণে সাইমন ২০২৬ সালের মে মাসে জার্মানিতে পৌঁছান। অন্যদিকে, জুলাই মাসে ভিসা পেয়ে সেপ্টেম্বরে জার্মানিতে পৌঁছান পাভেল।

বন্ধুর অপেক্ষায় থাকার অনুভূতি জানিয়ে সাইমন এশিয়া পোস্টকে বলেন, সামার সেশনে মে মাসে আমি আগে ভিসা পেলেও আমার সাফল্য যেন অধরাই থেকে গিয়েছিল, কারণ তখনো পাভেলের ভিসা হয়নি। পরবর্তীতে জুলাইয়ে যখন ও ভিসা পেল, তখনই আমার চূড়ান্ত সার্থকতা এলো।

বর্তমানে দুই বন্ধু জার্মানির বায়ার্ন অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা হলেও থাকার জায়গা তাদের একই। তাহমিদুর রহমান পাভেল ‘ইউনিভার্সিটি অব ভুর্ৎসবুর্গ’ -এ ‘ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক পলিসি’ (এমএসসি) এবং মো. সোয়েব আহমেদ সাইমন ‘ভাইহেনস্টেফান-ত্রিয়েসডর্ফ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস’ -এ ‘সাসটেইনেবল রিজিয়নাল ডেভেলপমেন্ট’ (এমএসসি) বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও বায়ার্নে একই ফ্ল্যাটে রুমমেট হিসেবে থাকছেন তারা।

পাভেলের কাছে একসঙ্গে মাস্টার্স করার এ সুযোগটাই দীর্ঘ প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় অর্জন। তিনি বলেন, অবশেষে একসঙ্গে থেকে আমরা মাস্টার্স করতে পারছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নিবিড় বন্ধুত্বই তাদের এই অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি। সাইমন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন থেকেই প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা একে অপরের পাশে থেকেছি। সেই নিবিড় বন্ধুত্ব থেকেই আমাদের স্বপ্ন ছিল স্কলারশিপ নিয়ে একসঙ্গে বিদেশে পাড়ি জমানোর।

তবে জার্মানিতে পৌঁছানোর পর তাদের পরিকল্পনা শুধু নিজেদের পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির সময় সঠিক তথ্য ও নিবিড় গাইডলাইনের অভাবে শিক্ষার্থীদের যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়, তা নিজেরা অনুভব করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তারা গড়ে তোলেন ‘গ্র্যাডরোড কনসালটেন্সি’ নামের একটি তথ্যসহায়ক প্ল্যাটফর্ম।

নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জুনিয়র ও সহপাঠীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষার দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, আবেদন প্রক্রিয়া ও আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি এরই মধ্যে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০-১২ জন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন, অফার লেটার প্রাপ্তি ও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয় হলের ৮৩৪ নম্বর কক্ষে যে স্বপ্নের শুরু, কয়েক বছরের নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতির পর তা এখন বাস্তব রূপ নিয়েছে জার্মানির বায়ার্নে। পড়ার বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্ন হলেও চার বছর এক কক্ষে কাটানো দুই বন্ধু এখনো আছেন একই ছাদের নিচে। তাদের এই গল্পে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সাফল্যের পাশাপাশি এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে গভীর বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা।