শাক-সবজি থেকে ক্যানসার প্রতিরোধী সিরাপ বানালেন রাবি গবেষকরা

লেবু, টমেটো, ধনিয়া পাতা ও পালং শাকের মতো সহজলভ্য শাক-সবজির নির্যাস ব্যবহার করে অ্যান্টিক্যানসার সাপ্লিমেন্ট সিরাপের একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ফার্মেসি বিভাগের একদল গবেষক। ক্যানসার প্রতিরোধে এসব খাদ্য উপাদানের সম্ভাব্য কার্যকারিতা পরীক্ষার অংশ হিসেবে প্রোটোটাইপটি তৈরি করা হয়েছে।
জানা যায়, ‘প্রাইসলেস এডিবল ফুডস: অ্যান অলটারনেটিভ সোর্স অব এক্সপেনসিভ অ্যান্টিক্যানসার ড্রাগস’ শীর্ষক গবেষণায় দেশের বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৬৮টি শাকসবজি, ফলমূল ও মসলাজাতীয় খাদ্য উপাদান নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করেন গবেষকরা। পরে ক্যানসার সেল লাইনের ওপর পরীক্ষার ভিত্তিতে পালং শাক, লেবুর খোসা, ধনিয়ার পাতা ও টমেটো নিয়ে আরও গবেষণা করা হয়।
গবেষণায় এসব নির্যাসের ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধ এবং অ্যাপোপটোসিস বা কোষমৃত্যু প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে মাউস মডেলেও সম্মিলিত নির্যাসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে চারটি উপাদানের নির্যাস সমন্বয়ে অ্যান্টিক্যানসার সাপ্লিমেন্ট সিরাপের প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়েছে।
গবেষক দলের সদস্যরা হলেন— রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এ এইচ এম খুরশীদ আলম, মো. আরিফুল ইসলাম, মো. রহমত আলী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ।
গবেষণাটির তথ্য ও ফলাফল গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নভোথিয়েটারে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এসময় গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রকাশনার তথ্যও পোস্টারে তুলে ধরা হয়।
গবেষকরা জানিয়েছেন, উদ্ভাবিত সিরাপটি এখনো গবেষণাগার পর্যায়ের একটি প্রোটোটাইপ। এটি ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত কোনো বাণিজ্যিক ওষুধ নয়। সিরাপের বোতলের লেবেলেও বিষয়টি স্পষ্ট করতে ‘ফর রিসার্চ পারপাস অনলি’ উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এ এইচ এম খুরশীদ আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আধুনিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও উচ্চমূল্যের বিষয়টি বিবেচনা করে আমরা দৈনন্দিন খাদ্য উপাদানের মধ্যে রোগ প্রতিরোধে সম্ভাবনাময় উপাদান খুঁজে বের করার উদ্যোগ নিই। প্রথম পর্যায়ে দেশের বাজার থেকে ৬৮টি শাকসবজি, ফলমূল ও মসলাজাতীয় খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করে সেগুলোর নির্যাস তৈরি করা হয়। পরে ক্যানসার সেল লাইনের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে পালং শাক, লেবুর খোসা, ধনিয়ার পাতা ও টমেটো- এই চারটি উপাদানকে নিয়ে আরও গবেষণা করা হয়। এসব নির্যাস ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধ এবং অ্যাপোপটোসিস বা কোষমৃত্যু প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে মাউস মডেলেও সম্মিলিত নির্যাসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা ক্যানসারের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, আলজাইমারসহ অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও সাপ্লিমেন্ট নিয়ে গবেষণা করছি।
গবেষণায় যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি স্টলে ছয়টি প্রকল্পের উদ্ভাবন প্রদর্শন করা হচ্ছে। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আমি এর আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ই-মেইলের মাধ্যমে গবেষণালব্ধ ও বাজারজাতকরণের সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন সম্পর্কে তথ্য আহ্বান করা হয়। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে কয়েকটি প্রকল্প নির্বাচন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্ভাবনের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও শিক্ষকদের সৃজনশীল চিন্তা এবং বাজারমুখী গবেষণার সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও অনেক উদ্ভাবনী গবেষণা চলমান রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, সহজলভ্য দেশীয় খাদ্য উপাদানের সম্ভাব্য ঔষধি গুণকে বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধানের এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে খাদ্য উপাদান থেকে নতুন ঔষধি বা সহায়ক উপাদান তৈরির সম্ভাবনা যাচাইয়ে সহায়ক হতে পারে।
