শেকৃবির উদ্ভাবিত স্মার্ট ড্রায়ারে বাড়বে মুনাফা, কমবে শ্রম ও সময়

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. মাসুদ রানা সৌরশক্তি ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির সমন্বয়ে কৃষিপণ্য শুকানোর একটি আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন।
‘এসএইউ স্মার্ট ড্রায়ার’ নামের এই প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কৃষিপণ্য শুকানো। এনক্লোজড চেম্বার বা আবদ্ধ ঘর হওয়ায় এখানে বাইরের ধুলাবালি কিংবা পোকামাকড় প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। ফলে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে এখানে যে কোনো কৃষিপণ্য শুকানো সম্ভব হচ্ছে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে খোলা আকাশে রোদে শুকানোর ক্ষেত্রে বিরূপ আবহাওয়া, ধুলাবালু ও পোকামাকড়ের সংক্রমণসহ নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এ ছাড়া সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ তো আছেই। বিশেষ করে ফল, সবজি ও মাছের মতো দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি বছর লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন দেশের কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা।
এসবের সমাধান নিয়ে এসেছে ‘এসএইউ স্মার্ট ড্রায়ার’। আবহাওয়ার ওপর নির্ভরতা দূর করাই এর বড় সাফল্য। স্মার্ট ড্রায়ারে স্বয়ংক্রিয় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকায় সার্বক্ষণিক শুকানোর কাজ অব্যাহত রাখা যায়। এর অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো মোবাইল সফটওয়্যারের মাধ্যমে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ সুবিধা। আইওটি ব্যবহারের ফলে খামারি বা উদ্যোক্তা ঘরে বসেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ড্রায়ারের ভেতরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এটি প্রযুক্তিনির্ভর তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী করতে এতে জ্বালানি হিসেবে প্রধানত সৌরশক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ অনেকাংশে কমে যায়, যা উৎপাদনের সার্বিক ব্যয় হ্রাস করে কৃষককে বাড়তি মুনাফা অর্জনে সাহায্য করে।
মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তির সুফল ইতোমধ্যেই দেখা গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের চৌফলদণ্ডীতে এটি পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৪২ থেকে ৪৫ ঘণ্টার মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের শুষ্ক পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকেও এটি বেশ সাফল্য দেখিয়েছে। কক্সবাজারের চৌফলদণ্ডীতে সুবিধাভোগীরা মাত্র ৩০ দিনে প্রায় ২ টন শুষ্ক পণ্য উৎপাদন করেছেন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৬ লাখ টাকা। কাঁচা পণ্য দ্রুত বিক্রি না করে এভাবে প্রক্রিয়াজাত করায় কৃষকের আয়ের নতুন উৎস তৈরি হচ্ছে।
উদ্ভাবনটির সুরক্ষায় ইতোমধ্যেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস থেকে ‘স্মার্ট ড্রায়ারের নকশা ও উন্নয়ন: প্রজন্মের পরবর্তী পর্যায়ের একটি আধুনিক শুকানোর প্রযুক্তি’ শিরোনামে এর নকশার কপিরাইট নিবন্ধন করা হয়েছে।
বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের এই উদ্ভাবন তুলে ধরার উদ্যোগ চলছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক ২০২৮ আইপি শেয়ারিং প্রকল্পসমূহতে প্রকল্প প্রস্তাবটি দাখিলের উদ্যোগ নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। প্রকল্প হিসেবে পাস হলে এটি বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি থেকে মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার এই সাফল্য দেশের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। তবে এটি সর্বস্তরের ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে যন্ত্রটির বাজারমূল্য ও বাণিজ্যিক সহজলভ্যতার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।




