ফেলানীর স্মরণে ডাকসুর খোলা চিঠি প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে আয়োজিত ফেলানীকে উদ্দেশ করে খোলা চিঠিলিখন প্রতিযোগিতা-২০২৬ এর পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেল ৫টায় ডাকসুর সভাকক্ষে এ পুরস্কার বিতরণী শুরু হয়। অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থ ও সনদ তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে সুফিয়া কামাল হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক সানজিদা আক্তার শ্রেয়সী বলেন, ফেলানী আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের এমন এক প্রতীক, যার আত্মত্যাগ আমাদের সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রক্ষা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা জোগায়। এই আত্মত্যাগকে ভুলে না গিয়ে, সীমান্ত হত্যার সঠিক বিচার ও দেশের স্বার্থরক্ষায় আমাদের জাতীয় সংগ্রামকে জিইয়ে রাখতে হবে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ বলেন, ফেলানীর আত্মত্যাগ আমাদের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। তার স্মৃতিকে ধারণ করে সীমান্ত হত্যা ও যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মকে সোচ্চার হতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, শহীদ ফেলানী আমাদের হৃদয়ের কাঁটায় ঝুলে থাকা এক রক্তজবার নাম। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ১১ বছরের এক অবুঝ শিশুকে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। এটি কেবল একটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড ছিল না, বরং দীর্ঘকাল ধরে এদেশের মানুষের ওপর ভারতীয় আধিপত্যবাদ, নিষ্পেষণ ও শোষণের এক নির্মম প্রতীক।
তিনি বলেন, গত ৫ আগস্টের পরে আশা করেছিলাম—সীমান্ত হত্যা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, কিংবা অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নেবে এবং বিগত ১৫-১৬ বছরের বৈষম্যমূলক চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা বা বাতিল করবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তেমন কোনো চুক্তি বাতিল করা হয়নি কিংবা সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে কোনো বলিষ্ঠ প্রতিবাদও আমরা দেখতে পাইনি। ভারতের রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের সময় গোপন চক্রান্ত ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডেল্টাগ্রামের প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট হয়ে, উচিত ছিল এই গণহত্যার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা। অথচ তাকে গ্রেপ্তার তো পরের বিষয়, রাষ্ট্র থেকে একটি সাধারণ প্রতিবাদ বিবৃতিও আমার চোখে পড়েনি।
মুসাদ্দিক আরও বলেন, সরকারের কাছে আমাদের দাবি—প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে হলেও ফেলানীসহ প্রতিটি সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের বিচার আদায় করতে হবে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার বিচার চায়নি বলে বিচার হয়নি, কিন্তু বর্তমান সরকারও যদি নীরব থাকে, তবে মানুষ ধরে নেবে আপনারাও একই ফ্যাসিবাদী হাসিনার আচরণের পুনরাবৃত্তি করছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাকসুরে এজিএস মহিউদ্দিন খান বলেন, ফেলানী আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক। এই হত্যাকাণ্ড পুরো জাতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রনীতিতে একটি কঠোর ও প্রশংসনীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। সীমান্ত হত্যার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে যদি ফেলানীর ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তার আত্মত্যাগকে খাটো করা হবে। এ দেশের নাগরিক হিসেবে মৃত্যুর পরও ফেলানীর সঠিক বিচার পাওয়ার পূর্ণ অধিকার ছিল।
মহিউদ্দিন খান বলেন, পররাষ্ট্রনীতিতে তিস্তার পানির ন্যায্য বণ্টন এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব কুক্ষিগত না রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার ক্ষেত্র রয়েছে। ফেলানীর আত্মত্যাগ যেন আমরা ভুলে না যাই, আমাদের আধিপত্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ধারায় যাতে তার স্মৃতির ধারাবাহিকতা থাকে—ডাকসু মূলত সেই কাজটাই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারীকে ৫ হাজার টাকা, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীকে ৩ হাজার টাকা এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারীকে ২ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ১৩ জন বিজয়ীকে সনদপত্র ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আসফাকউল্লাহ আসিফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আনাস ইবনে মুনির, আফসানা আকতার, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের ভিপি আহসান হাবীব ইমরোজ, সুহাইল মাহদীন, ডাকসু ও হল সংসদের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।



