জাবিতে দোকান বরাদ্দ নিয়ে দুই হলের সংঘর্ষ, আহত ৯

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দোকানের মালিকানা নিয়ে দুই আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত নয়জন শিক্ষার্থী আহত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলসংলগ্ন রবীন্দ্র চত্বরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল উদ্বোধনের পর হলসংলগ্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব দোকানের কয়েকটি বর্তমানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের সামনের অংশে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এসব দোকানের মালিকানা নিয়ে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্যোগে হল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ওই এলাকায় প্রায় ১৫টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তখন দোকান বরাদ্দের ক্ষেত্রে এক থেকে দুই লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল চালু হলে হলটির সামনের এলাকায় আগে থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের নামে বরাদ্দ থাকা কয়েকটি দোকান নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়। এর মধ্যে চারটি দোকানের ওপর নিজেদের অধিকার রয়েছে বলে দাবি করে কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীরা।
এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, রোববার রাতে কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ পরদিন তাঁদের হলের সামনে থাকা চারটি দোকানে তালা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে সোমবার দুপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের কয়েকজন শিক্ষার্থী রবীন্দ্র চত্বরে অবস্থান নেন।
পরে কাজী নজরুল ইসলাম হলের একদল শিক্ষার্থী সেখানে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি ও ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় লাঠি ও ইটপাটকেল ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংঘর্ষে আহত শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। পরে গুরুতর আহত দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের উপপ্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা রিজওয়ানুর রহমান সোমবার বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে বলেন, “এখন পর্যন্ত নয়জন শিক্ষার্থী আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সাভারের অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যরা চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন।”
ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবদুছ ছাত্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম হল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের দোকানগুলোর মালিকানা নিয়ে দুই হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। গতকাল মধ্যরাতের দিকে শিক্ষার্থীরা দোকান দখলের জন্য সংগঠিত হচ্ছেন— এমন খবর পেয়ে উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশে আমি ঘটনাস্থলে যাই।
সেখানে গিয়ে দেখি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের কিছু শিক্ষার্থী মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন করে চলে গেছেন। অন্যদিকে, কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীরা হলে বৈঠক করে দোকান দখলের পরিকল্পনা করছিলেন।
তিনি আরও বলেন, গত সাত মাস ধরে হল সংসদ ও প্রভোস্টদের সঙ্গে আলোচনা করেও কোনো সমাধান হয়নি বলে শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন। তাঁদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, সিন্ডিকেট সভা শেষে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করা হবে। কিন্তু এর মধ্যেই দুই হলের শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয়।
সংঘর্ষের বিষয়ে তিনি বলেন, একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই হলের শিক্ষক, প্রক্টর, ওয়ার্ডেন ও নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হয়। বর্তমানে উভয় পক্ষ নিজ নিজ হলে অবস্থান করছে। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, সকাল থেকেই দুই হলের প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা দফায় দফায় আলোচনা করেছি। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসার আগেই দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। খবর পেয়ে প্রক্টরসহ প্রশাসনের পুরো টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে।
তিনি বলেন, বর্তমানে দুই পক্ষ নিজ নিজ হলে অবস্থান করছে। দুই হলের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা চলছে।


