অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন শিক্ষার্থীরা, ক্যাম্পাসে উত্তেজনা

রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের (সাবেক হোম ইকোনমিকস কলেজ) অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রশাসনিক ভবনে তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে একপর্যায়ে কক্ষে তালা দিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করেন তারা। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত প্রায় আট ঘণ্টা ধরে অধ্যক্ষ কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একটি বিদায় অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি চলায় দুই আবাসিক শিক্ষার্থীর আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে অডিটোরিয়ামের এক রাতের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা দাবি করা হয়। এসব সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অধ্যক্ষের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলনে নামেন তারা।
বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীদের ‘দফা এক দাবি এক, প্রিন্সিপালের পদত্যাগ’ এবং ‘প্রিন্সিপালের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি রাত ১০টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা থাকলেও শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৪টা থেকে ৫টা বেজে যায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন অধ্যক্ষ। শিক্ষার্থীদের দাবি, পরে তারা অধ্যক্ষের কাছে ক্ষমা চাইতে গেলে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক রাতের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানাতে বৃহস্পতিবার সকালে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে যান তারা।
কলেজের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স প্রথম পর্বের শিক্ষার্থী তাবাসসুম বলেন, দুই শিক্ষার্থীর আসন বাতিলের সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক মনে করেই তারা প্রতিবাদ শুরু করেছেন। তার দাবি, ক্ষমা চাওয়ার পরও অধ্যক্ষ শাস্তি হিসেবে ১২ হাজার ৬০০ টাকা দিতে বলেছেন, যা শিক্ষার্থীদের পক্ষে বহন করা কঠিন।
তাবাসসুম আরও অভিযোগ করেন, জরিমানার অর্থ মওকুফের অনুরোধ জানাতে গিয়ে এক শিক্ষার্থী অধ্যক্ষের পা ধরলেও তিনি ওই শিক্ষার্থীকে পা দিয়ে ধাক্কা দেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধ্যক্ষের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলে তিনি তাদের বক্তব্য না শুনে ধমক দেন। এর পরই তারা তার কার্যালয়ে তালা দিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। তাদের দাবি, অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কলেজে বিভিন্ন অযৌক্তিক নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলনকারীরা জানান, প্রায় এক বছর আগে বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন অধ্যক্ষ মেহেরুন্নেছা। এর আগে সেখানে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি দুটি আবাসিক হলের ফ্রিজ ও বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এ ছাড়া আবাসিক হলগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও মাসিক ফি ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। আগামী বছর আরও ১০০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা। অধ্যক্ষ তার সরকারি বাংলোতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিরাগতদের সাবলেট দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা।
তবে দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়নি বলে জানিয়েছেন কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক হাবিবা ইয়াছমিন। তার ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রাথমিকভাবে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে আসন বাতিলের কথা বলা হয়েছিল।
উপাধ্যক্ষ জানান, কলেজ ক্যাম্পাসে বর্তমানে নির্মাণকাজ চলমান থাকায় সেখানে অনেক বহিরাগত শ্রমিক কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই রাত ১২টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পূজার ছুটির পর গত রোববার সিদ্ধান্ত হয়, ফাইনাল ইয়ারের ওই দুই শিক্ষার্থীর আসন বাতিল করা হবে না।
১২ হাজার ৬০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনুষ্ঠান ভোর ৫টা পর্যন্ত চলায় অডিটোরিয়ামের এসি ও ফ্যানের পেছনে ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল এসেছে। এ অর্থ হোস্টেলের সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাথাপিছু ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে সংগ্রহ করে পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল।
অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করার ঘটনার বিবরণ দিয়ে উপাধ্যক্ষ বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ও শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক অধ্যক্ষের কক্ষে অবস্থান করছিলেন। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী কথা বলার কথা বলে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে তাদের দুজনকে বাইরে ডেকে নেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অধ্যক্ষের কক্ষের দরজা বন্ধ করে তালা দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষকেরা কয়েক দফায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলেও তারা অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছেন। বিকেল ৫টার পর অধ্যক্ষকে আর ক্যাম্পাসে দেখতে চান না বলেও আলটিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা।
অধ্যক্ষের পদত্যাগের বিষয়ে উপাধ্যক্ষ বলেন, বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের নিয়োগ রাষ্ট্রপতির আদেশে হওয়ায় এভাবে সাদা কাগজে পদত্যাগ নেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং শিক্ষা সচিবকে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কলেজ প্রশাসন সর্বোচ্চ সহনশীল অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছার বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করা হলে শিক্ষার্থীরা বাধা দেন এবং কার্যালয়ের তালা খুলতে অস্বীকৃতি জানান। এদিকে, অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।