Advertisement

ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপে চীনে যবিপ্রবির শিক্ষার্থী দম্পতি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, যবিপ্রবি
ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপে চীনে যবিপ্রবির শিক্ষার্থী দম্পতি
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পরিচয়, এরপর বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও বিয়ে। সম্পর্কের সেই মেলবন্ধনের পাশাপাশি দুজনে মিলে লড়েছেন একই স্বপ্ন পূরণের জন্য। একবার বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পাশাপাশি হারিয়েছেন সঞ্চিত অর্থও। তবু দমে যাননি। সব বাধা পেরিয়ে এবার ফুল ফান্ডেড ‘চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ (সিএসসি)’ নিয়ে পিএইচডি করতে চীনে যাচ্ছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থী দম্পতি নাহিদ হাসান ও সোহেলী আশরাফ।

চীনের খ্যাতিমান সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির স্কুল অব আর্কিটেকচারে একই সঙ্গে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন তারা। নাহিদ ও সোহেলী দুজনই যবিপ্রবির পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (ইএসটি) বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। নাহিদের বাড়ি যশোর সদর উপজেলায় এবং সোহেলীর বাড়ি ঝিকরগাছার ছুটিপুর এলাকায়।

তাদের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, গবেষণার প্রতি তীব্র আগ্রহ, কঠোর পরিশ্রম এবং একে অপরের প্রতি অটুট আস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে ফল আশানুরূপ না হলেও ধীরে ধীরে নিজেদের ঘুরে দাঁড় করান তারা। অনার্স শেষে নাহিদ ৩.৩০ এবং সোহেলী ৩.৫৬ সিজিপিএ অর্জন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে তাদের সম্পর্কের সূচনা। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। দুজনেরই মূল স্বপ্ন ছিল বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা করা। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

তৃতীয় বর্ষ থেকেই তারা গবেষণাগারে নিয়মিত সময় দিতে শুরু করেন। ক্লাসের পাশাপাশি গবেষণাপত্র পড়া, ল্যাবে কাজ করা এবং প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত টিউশনি করেই কাটত তাদের সময়। শত ব্যস্ততার মধ্যেও উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি তারা। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাজ্যে যাওয়ার; যেখানে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রাইটনে একজন মূল আবেদনকারী এবং অন্যজন স্পাউস হিসেবে যাবেন।

তবে যুক্তরাজ্যের সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পাশাপাশি হারাতে হয় কষ্ট করে জমানো কিছু অর্থও। হঠাৎ করেই থমকে যায় তাদের স্বপ্ন। তবে সেই ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে কঠিন সময়েও একে অপরকে সাহস দিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করেন তারা।

এরপর আরও পরিকল্পিতভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে থাকেন এই দম্পতি। গবেষণাপত্র প্রকাশ, আইইএলটিএস পরীক্ষা, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন এবং বিভিন্ন দেশের সম্ভাব্য সুপারভাইজারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যান।

একপর্যায়ে তাদের অদম্য প্রচেষ্টার ফল মিলতে শুরু করে। নাহিদ চীনের মর্যাদাপূর্ণ CAS-ANSO স্কলারশিপ এবং থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (AIT) থেকে পিএইচডির জন্য আংশিক অর্থায়নের সুযোগ পান। অন্যদিকে সোহেলীও যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেইনের এক অধ্যাপকের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পান।

তবে তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে গবেষণার সুযোগ পাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ করে চীনের সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ এবং সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের সম্মতি মেলার পর চলতি বছরের ৭ জুলাই দুজনই চাইনিজ গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ (সিএসসি) অর্জন করেন।

আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ভিসা হাতে পাওয়ার আগে বিষয়টি তারা কাউকে জানাননি। গত ২০ জুলাই ভিসা পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের এই সুখবরটি দেন। সন্তানের এমন অর্জনের কথা শুনে দুই পরিবারের সদস্যরাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

নিজেদের এই অর্জনের পেছনে শিক্ষকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন নাহিদ ও সোহেলী। তারা জানান, বিএসসি থিসিস সুপারভাইজার ড. হাসিবুর রহমান এবং এমএসসি থিসিস সুপারভাইজার ড. নাজনীন নাহার সবসময় তাদের উৎসাহ দিয়েছেন। গবেষণার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা ও দাপ্তরিক কাজেও তারা অভিভাবকের মতো পাশে ছিলেন।

ভবিষ্যতে দেশে ফিরে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার ইচ্ছার কথা জানান এই দম্পতি। তাদের আশা, অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবেন।

অনুজদের উদ্দেশ্যে নাহিদ ও সোহেলীর পরামর্শ হলো—নিজের সামর্থ্য নিয়ে সন্দেহ না করে লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যেতে হবে। তারা বলেন, দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই গবেষণাগারে সময় দেওয়া, গবেষণাপত্র প্রকাশে মনোযোগী হওয়া, আইইএলটিএসের প্রস্তুতি নেওয়া এবং এসপিএসএস, অরিজিন কিংবা পাইথনের মতো প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার শেখা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়মিত সিভি হালনাগাদ রাখা এবং যেসব কাজে দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা বাড়ে না, সেগুলোতে সময় নষ্ট না করাই শ্রেয়।