logo
Advertisement

যুক্তরাজ্যে কোটি টাকার ফেলোশিপ পেলেন ববি শিক্ষার্থী হৃদয়

যুক্তরাজ্যে কোটি টাকার ফেলোশিপ পেলেন ববি শিক্ষার্থী হৃদয়
হৃদয় হাওলাদার। ছবি : ফেসবুক থেকে পাওয়া

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. হৃদয় হাওলাদার যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন। গবেষণার জন্য তিনি নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি ওভারসিজ রিসার্চ স্কলারশিপ (এনইউওআরএস) ও টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পেয়েছেন। এর আওতায় তিন বছরে তিনি প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ টাকা সমপরিমাণ আর্থিক সুবিধা পাবেন।

হৃদয় হাওলাদার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভাগটি প্রতিষ্ঠার পর তিনিই প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে পিএইচডির জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন সুযোগ পেলেন।

২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে শুরু হতে যাওয়া এই পিএইচডি প্রোগ্রামে এনইউওআরএস স্কলারশিপের আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির পার্থক্য তিন বছর পর্যন্ত বহন করা হবে।

হৃদয়ের গবেষণার আগ্রহের ক্ষেত্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অভিবাসন ও শরণার্থী অধ্যয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ রাজনীতি। এসব বিষয়ে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন তিনি। তার গবেষণায় ভারত-বাংলাদেশের পানি বিরোধের ভূরাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রভাব, রোহিঙ্গা সংকট, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জলনিরাপত্তা, জলবায়ু রাজনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব উঠে এসেছে।

তার উল্লেখযোগ্য গবেষণার একটি ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড প্রসপেক্টস’। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্প্রিংগারের ‘ডিসকভার গ্লোবাল সোসাইটি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক এবং বাংলাদেশের সংকট ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জলনিরাপত্তা ও জলবায়ু রাজনীতি নিয়ে তার আরেকটি গবেষণা ‘হাইড্রোলজিক্যাল হেজেমনি অ্যান্ড ইউএস স্ট্র্যাটেজিক এনগেজমেন্ট ইন ক্লাইমেট অ্যান্ড ওয়াটার সিকিউরিটি’। এতে পানিসম্পদ, জলবায়ু ঝুঁকি, অভিবাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা নিয়েও গবেষণা করেছেন হৃদয়। ‘ইউএস-চায়না রাইভ্যালরি অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব গ্লোবাল সিকিউরিটি’ শিরোনামের গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও ফাইভজি প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এবং এর বৈশ্বিক নিরাপত্তায় প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশের আন্তসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। ‘অ্যাসেসিং জিওপলিটিক্যাল অ্যান্ড সোশিও-ইকোনমিক কনসিকোয়েন্সেস অব ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ওয়াটার ডিসপিউটস’ গবেষণায় পানি বিরোধের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক ও বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এর আগে, ডেনমার্কের অ্যালবর্গ ইউনিভার্সিটিতে ‘এমএসসি ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড গ্লোবাল রিফিউজি স্টাডিজ’ পড়তে যান হৃদয়। সেখানে তার পরিকল্পনা ছিল মাস্টার্স শেষ করে উত্তর আমেরিকায় পিএইচডি করা। তবে কাজের অনিশ্চয়তা, সিপিআর-সংক্রান্ত জটিলতা ও কিছু বাস্তব সমস্যার কারণে তিনি দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

হৃদয় বলেন, ‘আমার মূল লক্ষ্য ছিল গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে একটি একাডেমিক ক্যারিয়ার তৈরি করা। তাই সাময়িক সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিয়েছি।’

ডেনমার্কের বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভর্তি বাতিল করায় তিনি টিউশন ফির ৭৫ শতাংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পান। একই সময়ে দেশে ফিরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের চূড়ান্ত পরীক্ষাও শেষ করেন। দেশে ফিরে গবেষণায় মনোযোগ দেন হৃদয়। ডেস্কভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি সুন্দরবনে মাঠপর্যায়ের গবেষণাতেও যুক্ত হন। গবেষণাপত্র লেখা, তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে কাজের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের একাডেমিক প্রোফাইল তৈরি করেন।

তবে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না বলে জানান হৃদয়। তার ভাষ্য, অনেকে তার এই সিদ্ধান্তকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছিলেন। এমনকি পরিবারকেও নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এ সময়ে পরিবার, শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও সহকর্মীরা তাকে সহযোগিতা করেছেন।

ববির সাবেক শিক্ষার্থী হৃদয় বলেন, ‘এই অর্জন শুধু আমার একার নয়। পরিবারের ত্যাগ, শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা এবং কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষের বিশ্বাস আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’

এখন যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটিতে নতুন একাডেমিক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন হৃদয়। গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি এবং একজন দায়িত্বশীল গবেষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।