logo

বিরল প্রজাতির যে পাখির অবাধ বিচরণ রাবি ক্যাম্পাসে

বিরল প্রজাতির যে পাখির অবাধ বিচরণ রাবি ক্যাম্পাসে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিরল বামুনশালিক। ছবি: ফাহিম মুন্তাসির রাফিন

ভোরের নরম আলো। ঘাসের ফাঁকে ব্যস্ত এক ছোট্ট পাখি। ঠোঁট দিয়ে একটু একটু করে খাবার কুড়িয়ে নিচ্ছে। প্রথম দেখায় পাখিটিকে সাধারণ শালিক মনে হলেও গভীরভাবে তাকালেই ধরা পড়ে তার ভিন্নতা। এ বিরল এক সুন্দর অতিথি। ভাতশালিক, ঝুঁটিশালিক, গোশালিক কিংবা কাঠশালিকদের দেশের যে কোনো জায়গায় দেখা গেলেও এই পাখিটির দেখা সহজে মেলে না। পাখিটির নাম বামুনশালিক বা শঙ্খশালিক।

দেশের অনেক অঞ্চল থেকে বামুনশালিক প্রায় হারিয়ে গেলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে সারা বছরই এদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ে। গবেষকদের মতে, নিরাপদ আবাস, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং অনুকূল পরিবেশের কারণেই দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসটি পাখিটির অন্যতম প্রধান আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।

খোলামেলা বৃক্ষবাগান, তৃণভূমি, ভেজা মাঠ, চাষের জমি ও ঝোপঝাড় বামুনশালিকের পছন্দের প্রধান আবাসস্থল। অন্য শালিকের তুলনায় এরা কিছুটা কম দলবদ্ধ হলেও পর্যাপ্ত খাবার পেলে ঝাঁক বেঁধে আসে। মাটিতে পোকামাকড় খুঁজে বেড়ালেও গাছে থাকতে এরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অন্য শালিকের চেয়ে এদের ওড়ার গতিও বেশি এবং এরা অন্য পাখির ডাক অনুকরণেও বেশ পারদর্শী। বাংলাদেশে রাজশাহী বিভাগের বৃক্ষবহুল এলাকাতেই এ পাখির উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

আকারে মাঝারি এই পাখিটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ সেন্টিমিটার। স্ত্রী ও পুরুষ বামুনশালিক দেখতে প্রায় একই রকম। মাথা কালো এবং ঘাড়ের পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত কালো ঝুঁটি বা চূড়া প্রাপ্তবয়স্ক পাখির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। শরীরের ওপরের অংশ ধূসর, গলা ও লেজে থাকে পাটকিলে আভা। লেজের নিচে দেখা যায় সাদা ছোপ। ঠোঁট বেশ শক্ত, গোড়ায় নীলচে, মাঝখানে সবুজাভ এবং ডগা হলদেটে। চোখের নিচে নীল-হলুদ রঙের অনাবৃত চামড়া ও হলুদ পা পাখিটিকে সহজেই আলাদা করে চেনায়। তবে অল্পবয়সী বামুনশালিকের মাথায় ঝুঁটি থাকে না এবং তাদের দেহের নিচের অংশ তুলনামূলক ফ্যাকাশে কমলা রঙের হয়ে থাকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রজনন হয় বিরল বামুনশালিকের। ছবি: ফাহিম মুন্তাসির রাফিন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রজনন হয় বিরল বামুনশালিকের। ছবি: ফাহিম মুন্তাসির রাফিন

বামুনশালিক সাধারণত পুরোনো গাছের কোটর, দেয়ালের ফাঁকা অংশ কিংবা পরিত্যক্ত গহ্বরে বাসা বাঁধে। সুযোগ পেলে মানুষের ঝুলিয়ে দেওয়া কাঠের বাক্স বা মাটির হাঁড়িকেও বাসা হিসেবে ব্যবহার করে। শুকনো ঘাস, পাতা ও পালক দিয়ে বাসা তৈরি করে এ পাখি। সাধারণত তিন থেকে চারটি নীলচে রঙের ডিম পাড়ে। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখি মাথার ঝুঁটি খাড়া করে গান গায়। খাবার হিসেবে ফল ও পোকামাকড় বেশি পছন্দ। পাকা ফল, বিশেষ করে জাম এদের খুব প্রিয়। তা ছাড়া ফুলের মধুও এরা পছন্দ করে খায়।

রাবিতে এ পাখিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও আলোকচিত্রী ফাহিম মুন্তাসির রাফিন বলেন, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথম বামুনশালিকের দেখা পাই। তখনই ক্যামেরা নিয়ে ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি শুরু করেছি। প্রথম দিনেই পশ্চিমপাড়ায়, সিরাজী ভবনের পেছনের ঘাসের মধ্যে খাবার খুঁজতে দেখি। সেখান থেকেই এ প্রজাতির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়।

ক্যাম্পাসে এ পাখির বিচরণ এলাকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের পশ্চিমপাড়া, সিলসিলা এলাকার আশপাশ, শহীদ মিনার, হেলিপ্যাড, জুবেরি এলাকা, মেইন গেটসহ প্রায় পুরো ক্যাম্পাসেই এদের বিচরণ রয়েছে। তবে ডাস্টবিনের আশপাশে খাবার বেশি পাওয়ায় ওই এলাকাগুলোতে তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিরল বামুনশালিক। ছবি: ফাহিম মুন্তাসির রাফিন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিরল বামুনশালিক। ছবি: ফাহিম মুন্তাসির রাফিন

সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি জানান, প্রজনন মৌসুমে পাখিদের বিরক্ত না করা, বাচ্চা না ধরা এবং ক্ষতির চেষ্টা হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব। একই সঙ্গে বাইরে থেকে এসে পাখির বাচ্চা চুরির ঘটনা ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।

পাখি গবেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুজ্জামান মো. সালেহ রেজা বলেন, আমাদের বসবাসের জন্য যেমন কিছু মৌলিক চাহিদা আছে, তেমনি পাখিদেরও আছে। খাদ্য, আবাসস্থল, নিরাপত্তা ও অনুকূল পরিবেশ একটি পাখির টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এগুলো সবই যদি কোনো জায়গায় থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তারা সেখানেই থাকবে। এই ক্যাম্পাসে বামুনশালিকের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে বলেই তারা এখানে অবস্থান করছে।

প্রজননের বিষয়ে তিনি বলেন, একটি পাখি সাধারণত যে জায়গায় নিরাপদে বসবাস করে, সেখানেই প্রজনন করে। বামুনশালিকের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখানে রয়েছে বলেই তারা এ ক্যাম্পাসে প্রজনন করে। সাধারণত মার্চ থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত এ পাখির প্রজননকাল।

তিনি আরও বলেন, দেশের সব জায়গায় এ পাখি দেখা যায় না, কারণ একেক অঞ্চলে একেক প্রজাতির পাখির আধিক্য থাকে। যেমন সুন্দরবন বা চট্টগ্রামে কিছু পাখি বেশি দেখা যায়, যেগুলো এখানে পাওয়া যায় না। একইভাবে বামুনশালিকের আধিক্য যেমন এখানে বেশি, অন্য কোথাও তা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশেষ কোনো কৃত্রিম উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। শুধু তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল যেন নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ পরিবেশ ও আবাসস্থল অনুকূল না থাকলে তারা স্বাভাবিকভাবেই অন্য জায়গায় চলে যাবে।