ঢাবির ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করলেন তাহসিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে নিজ বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করেছেন ২০২৩ বর্ষের শিক্ষার্থী এ আর তাহসিন জাহান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালে মবের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুকে অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা জানান। বর্তমানে তাহসিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ইন পাবলিক পলিসি (এমপিপি) প্রোগ্রামে মাস্টার্স করছেন।
ফেসবুক পোস্টে তাহসিন জাহান লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার চার বছরের স্নাতক জীবনের শুরু থেকেই আজকের দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছি। অসংখ্য নির্ঘুম রাত, চার বছরের কঠোর পরিশ্রম আর নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার পর নিজ বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে আজ আমার ডিনস অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু আমি সেই ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান করেছি।’
তিনি লেখেন, যারা এই পুরস্কারটির সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য বলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে স্নাতক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য ডিনস অ্যাওয়ার্ড অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্বীকৃতি। একসময় যে পুরস্কারটি অর্জনের জন্য এতটা পরিশ্রম করেছি, আজ সেটিই প্রত্যাখ্যান করা আমার জন্য সহজ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু কোনো পুরস্কারের মর্যাদা আমার কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়।
এই পুরস্কার গ্রহণ করার অর্থ হতো এমন একটি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি উদ্যাপন করা, যে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন নিজেদের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করেনি।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওই শিক্ষার্থী লেখেন, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি মবের আক্রমণের শিকার হন। কোনো ধরনের সহিংসতার সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও নিজের বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে হুমকির মুখে পড়েছিলেন। তাকে ফাইনাল ভাইভায় অংশ নিতে এবং স্নাতক থিসিস জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
শারীরিক নিরাপত্তার কারণে একপর্যায়ে ক্যাম্পাসে ফিরতে না পারলেও বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক তার শিক্ষার অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তাদের সহযোগিতায় নিরাপদ স্থান থেকে অনলাইনে ফাইনাল ভাইভায় অংশ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করতে পেরেছেন বলে জানান ওই শিক্ষার্থী।
পোস্টে তিনি লেখেন, যেসব শিক্ষক আমাকে এত দূর আসতে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা। আমার অর্জনের পেছনে তাদের অবদান রয়েছে এবং সেই কৃতিত্ব তাদের প্রাপ্য। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তার মতো ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এখনও নিজেদের শিক্ষাজীবন স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। প্রশাসন নীরব থেকেছে এবং মৌলবাদী মবকে নীরবে সমর্থন করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। এমনকি কারাগারে থাকা সবচেয়ে গুরুতর অপরাধীরও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন নিজেদের শিক্ষার্থীদের সেই অধিকার রক্ষায় কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নেয়নি।
শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি লেখেন, যেসব শিক্ষক আমাকে এতদূর আসতে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা। আমার অর্জনের পেছনে তাদের অবদান রয়েছে এবং সেই কৃতিত্ব তাদের প্রাপ্য। কিন্তু তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যে প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেই প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার গ্রহণ করে আমি নিজের অর্জন উদ্যাপন করতে পারি না।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অনুষদের ১৬টি বিভাগের মোট ৪৮ জন শিক্ষার্থী এবং সেরা গ্রন্থ ও নিবন্ধের জন্য দুজন শিক্ষকের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।


