Advertisement

রাবিতে টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ, দুই দফায় জমা হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, রাবি
রাবিতে টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ, দুই দফায় জমা হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) হল ব্যবস্থাপনা অটোমেশন সফটওয়্যার ও মোবাইল অ্যাপ প্রস্তুতসংক্রান্ত টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে ২৯ লাখ টাকার কাজ বাড়িয়ে ৪৫ লাখ টাকায় দেওয়ার অভিযোগ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ঘটনা অনুসন্ধানে গঠিত দুই দফার তদন্ত কমিটির কার্যক্রম নিয়েও চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

Advertisement

অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত প্রকল্পের কাজের জন্য আহ্বান করা দরপত্রে দেশের ৬টি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কারিগরি মূল্যায়ন শেষে আর্থিক প্রস্তাবনার (ফিন্যান্সিয়াল বিড) জন্য এডিসফট, রাজআইটি সলিউশন ও সফটবিডিকে নির্বাচিত করা হয়। বাদ পড়ে হেডলেস টেক, এক্সেল টেক ও ইথার টেক। কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে (২৯ লাখ টাকায়) কাজটি করতে চেয়েছিল ‘সফটবিডি’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ টাকা দর হাঁকানো ‘এডিসফট লিমিটেড’-কে কাজটি দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই কারিগরি মূল্যায়নে মনোনীত ৩টি সংস্থাকে আর্থিক প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়, যেখানে ১১টি শর্ত উল্লেখ ছিল। কিন্তু দরপত্রের মূল বিজ্ঞপ্তির বাইরে গিয়ে আর্থিক প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে নতুন দুটি কারিগরি শর্ত যুক্ত করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, কম দরদাতাকে বাদ দিয়ে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ করে দিতেই এই কৌশলী শর্ত জোড়া হয়, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, কারফিউ ও উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে ২৯ জুলাই রাবি আইসিটি সেন্টারে দরপত্র মূল্যায়নের বৈঠক ডাকা হয়। গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পরদিন ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট নির্ধারণ করা হয় আর্থিক প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শীর্ষ প্রশাসন পদত্যাগ ও আত্মগোপনে থাকা এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার সুযোগে এ স্পর্শকাতর কাজটি সম্পন্ন করা হয়। সাধারণত দরপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার দপ্তরে জমা নেওয়া হলেও, এ ক্ষেত্রে আইসিটি সেন্টারের নিজস্ব বাক্সে দরপত্র জমা নেওয়া হয়।

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) অনুযায়ী প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতে দরপত্র খোলা (টেন্ডার ওপেনিং), মূল্যায়ন (টেন্ডার ইভালুয়েশন) এবং সরবরাহকৃত সেবা বুঝে নেওয়ার (রিসিভিং) জন্য পৃথক পৃথক কমিটি গঠন আইনত বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, আইসিটি সেন্টারের তৎকালীন পরিচালক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষক ড. খাদেমুল ইসলাম মোল্যা এবং তৎকালীন ডিন ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বিজয়ী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজটি বুঝে নেওয়ার জন্য গঠিত ‘টেকনিক্যাল কমিটি’ দিয়েই ওপেনিং, ইভালুয়েশন ও ফাইনাল রিসিভিংয়ের সব কাজ সম্পাদন করিয়েছেন— যা স্পষ্টত পিপিআর আইনের লঙ্ঘন।

সেই টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি ছিলেন তৎকালীন ডিন ড. বিমল কুমার প্রামাণিক। সদস্য হিসেবে ছিলেন প্রভোস্ট কাউন্সিলের তৎকালীন সভাপতি ও সিএসই বিভাগের অধ্যাপক আসিফ জামান, সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহবুব কাওছার, সহযোগী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার চক্রবর্তী এবং আইসিটি সেন্টারের নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী রাহেল মাহফুজ সরকার।

এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০২৫ সালের আগস্টে জমা দেওয়া সেই রিপোর্টে অভিযুক্ত শিক্ষকদের আড়াল করে কেবল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট ৫৪১তম সিন্ডিকেট সভায় তৎকালীন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ড. মাঈন উদ্দীনকে প্রধান করে ৩ সদস্যের আরেকটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে রহস্যজনকভাবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এই কমিটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, আর্থিক দরপত্র খোলার ঠিক আগে নতুন শর্ত যুক্ত করা আইনবহির্ভূত। কম দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে বাদ দিয়ে পছন্দের সর্বোচ্চ দরদাতাকে সুবিধা দিতেই এমনটা করা হয়েছে। তাছাড়া পৃথক কমিটির পরিবর্তে একটিমাত্র কমিটি দিয়ে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা নিয়মের চরম লঙ্ঘন।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে তৎকালীন টেকনিক্যাল কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. বিমল কুমার প্রামানিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, এ বিষয়ে দুই বছর ধরে তদন্ত চলছে এবং আমরা তদন্ত কমিটির কাছে সব বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছি। আমাদের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অসত্য।

একই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. শামীম আহমদ এবং আইসিটি সেন্টারের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক ড. খাদেমুল ইসলাম মোল্যার মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তা রিসিভ হয়নি।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটির সভাপতি ও সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাঈন উদ্দীন এশিয়া পোস্টকে জানান, দায়িত্ব হস্তান্তরের পর বর্তমানে বিষয়টি বর্তমান উপ-উপাচার্যের (প্রশাসন) এখতিয়ারভুক্ত।

এ বিষয়ে বর্তমান উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলিম এশিয়া পোস্টকে জানান, তদন্ত কাজ চলমান। প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ হয়নি। প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষে বিষয়টি সিন্ডিকেটে উত্থাপন করা হবে।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে জানান, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা হওয়ার কথা থাকলেও বিস্তারিত তথ্য খোঁজ নিয়ে পরবর্তীতে জানাতে পারবেন।