রাজনীতি নিষিদ্ধের দুই বছর, কতটা ‘রাজনীতিমুক্ত’ যবিপ্রবি?

জুলাই বিপ্লবের পর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছিল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের পর দীর্ঘ সময় ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে কোনো দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম দেখা যায়নি। তবে সম্প্রতি আবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দেখা গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—কাগজে-কলমে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে কতটা রাজনীতিমুক্ত যবিপ্রবি?
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রিজেন্ট বোর্ডের ১০৩তম জরুরি সভায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। সভা, মিছিল, মানববন্ধন কিংবা একাডেমিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করাকেও এর আওতায় রাখা হয়। একইভাবে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক মতামত প্রচার বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব নিয়ম ভঙ্গ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর বেশ কিছুদিন ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতির প্রকাশ্য কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও বিভিন্ন শিক্ষার্থীবান্ধব কার্যক্রমে যুক্ত হয়। তবে সম্প্রতি ছাত্রদলপন্থী শিক্ষার্থীদের ‘জাতীয়তাবাদী শিক্ষার্থী ফোরাম’ নামে বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে ছাত্রদলের ব্যানারে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের প্রকাশ্য তৎপরতা সামনে আসে। এরপর ভর্তি পরীক্ষায় হেল্পডেস্ক, নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ, দোয়া মাহফিল ও বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে তাদের উপস্থিতি দেখা যায়।
এ ছাড়া ‘যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল’ নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেজ পরিচালনা এবং প্রকাশ্যে নিজেদের ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরেও দলীয় পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্য কোনো সাংগঠনিক আত্মপ্রকাশ না ঘটলেও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রকাশনী আইসিএস পাবলিকেশনের স্টিকার দেখা গেছে। মুন্সি মেহেরুল্লাহ হলের নোটিশ বোর্ড, লিফট, বিভিন্ন একাডেমিক ভবন ও মসজিদেও এসব স্টিকার থাকার কথা জানা গেছে।
এদিকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুন্সি মেহেরুল্লাহ হলের বিভিন্ন দেয়াল ও লিফটের সামনে ছাত্রলীগের নামে বিভিন্ন স্লোগান দেখা যায়। পরে গত ২৫ জুলাই যবিপ্রবি ছাত্রলীগের ১৯ সদস্যের একটি কমিটি অনুমোদনের খবরও আসে। তবে ওই কমিটিতে থাকা কয়েকজনের বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে ছাত্রত্ব নেই বলেও জানা গেছে।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিয়ে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্ট দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
এ ছাড়া কয়েকজন শিক্ষক নিজেদের বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ‘সাদা দল’-এর কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। পরে সেই কমিটির একটি খসড়া তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে যায়। একইভাবে আওয়ামী পন্থী শিক্ষকদের একটি অংশও ক্যাম্পাসে তৎপর রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্নমতও রয়েছে। জুলাই-পরবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসে দলীয় ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের দাবি, দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র সংসদের কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ছাত্রদলের ব্যানারে রাজনীতি করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. হামিদুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী প্রক্টর দপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ক্যাম্পাসে রাজনীতি ও র্যাগিং নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমানে সবার সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় কেউ প্রকাশ্যে বা গোপনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালালে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ব্যক্তি নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করতেই পারেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি লঙ্ঘন করলে প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা বা কর্মচারী—যেই হোন না কেন, ক্যাম্পাসে দলীয় পরিচয়ে মিছিল, সভা-সমাবেশ বা কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনলাইন প্রচারণার ব্যাপারে তিনি বলেন, ফেসবুকে অনেকে অনেক কিছু লিখতে পারে। তবে কেউ সংঘবদ্ধভাবে করছে কিনা, সেটা দেখার বিষয়। আমরা যদি তেমন কোনো কার্যক্রম দেখি তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


