logo

পরিকল্পনা ছাড়া হকার উচ্ছেদ টেকসই নয়, দরকার নীতিমালা ও আইন: আইপিডি

পরিকল্পনা ছাড়া হকার উচ্ছেদ টেকসই নয়, দরকার নীতিমালা ও আইন: আইপিডি

রাজধানীতে হকার উচ্ছেদে বিচ্ছিন্ন অভিযান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না বলে সতর্ক করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলছে, হকার ব্যবস্থাপনার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা, আইন, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা ছাড়া উচ্ছেদ কার্যক্রম টেকসই সমাধান দিতে পারবে না।

আইপিডি জানায়, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানে কোথাও সাময়িক স্বস্তি মিললেও অনেক জায়গায় হকাররা আবার ফিরে এসেছে। কোথাও উচ্ছেদকৃত স্থানে অবৈধ গাড়ি পার্কিংসহ নতুন দখল তৈরি হয়েছে। এমনকি উচ্ছেদের অজুহাতে চাঁদাবাজি বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সংস্থাটির মতে, রাজধানীতে হকার সমস্যার পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে, যার সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহল, লাইনম্যান, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সদস্যরাও জড়িত। এই চক্রকে চিহ্নিত ও ভেঙে না দিলে কেবল হকার উচ্ছেদ করে কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

আইপিডি বলছে, প্রায় ২ কোটির বেশি মানুষের এই মেগাসিটি ঢাকায় ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা জরুরি। তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো—দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের জীবিকার একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে হকারি। ফলে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ চালালে হকাররা আবারও ফিরে আসবে।

এ প্রেক্ষাপটে আইপিডি হকার সমস্যার টেকসই সমাধানে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, ঢাকার ফুটপাতকে সারা দেশের দারিদ্র্যের ভার বহনের জায়গা বানানো যাবে না; বরং বিকেন্দ্রীকরণ ও বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

আইপিডি বলছে, হকার সমস্যার সমাধানে সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও হকারদের নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ফুটপাতে কে, কখন বসছেন—তা চিহ্নিত করতে হকারদের ডাটাবেজ তৈরি করে তালিকাভুক্ত করা জরুরি, অন্যথায় হকারের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উচ্ছেদের পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থানে বা সময়ে বসবার ব্যবস্থা করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ঢাকার হকার সমস্যার টেকসই সমাধানে আইপিডির পক্ষ থেকে ১০ দফা প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো:

১. পরিকল্পিত হকার জোন: গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত ও করিডোর দখলমুক্ত রাখবার পাশাপাশি, যেসব সড়কে সুযোগ আছে, সেখানে পরিকল্পনামাফিক নির্দিষ্ট এলাকায় বৈধভাবে হকার বসার ব্যবস্থা করা।

২. হকার নিয়ন্ত্রণ: অনুমোদনহীন হকার যত্রতত্র অবাধে নতুন করে হকার বসার বিভিন্ন বন্দোবস্তকে প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের স্থানীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি করে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

৩.  লাইসেন্সিং ও ডাটাবেজ তৈরি: বিদ্যমান হকারদের বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিকেশন, জিও-লোকেশন চিহ্নিতকরণ, ডিজিটাল আইডি, লাইসেন্স, নিবন্ধিত হকার তালিকা অতি দ্রুত প্রণয়ন করার মাধ্যমে হকারদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা। পাশাপাশি নগরে নির্দিষ্ট স্থান ও এলাকা চিহ্নিত করবার মাধ্যমে পিক আওয়ারে ফুটপাত পথচারীর জন্য ও অফ-পিক সময়ে নিয়ন্ত্রিত হকার কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া।

৪. পুনর্বাসন ও বিকল্প বাজার: হলিডে মার্কেট, নাইট মার্কেট, অস্থায়ী ও স্থায়ী মার্কেট শেড তৈরি করা। 

৫. কাঠামোগত সংস্কার: চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য সিটি করপোরেশন, ওয়ার্ড কাউন্সিল, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয় নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা।

৬.  অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা: হকার, নাগরিক ও পথচারী, ব্যবসায়ী, সিটি করপোরেশন ও প্রশাসন— সব পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে হকার ও দারিদ্র্য সমস্যার সমন্বিত সমাধানের জন্য অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।

৭. চাঁদাবাজ সিন্ডিকটদের আইনের আওতায় আনা: হকার সংশ্লিষ্ট চাঁদাবাজি ও দখলদারদের যে অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তাদের চিহ্নিত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। জড়িতদের রাজনৈতিক-সামাজিক-অফিসিয়াল পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অতিসত্বর আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৮. নীতিমালা ও আইন: হকার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।

৯. সামাজিক সুরক্ষা: যে সকল হকারদের পুনর্বাসন সম্ভবপর হবে না, নগর দরিদ্র হিসেবে তাদের চিহ্নিত করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে এসে ফ্যামিলি কার্ডের বন্দোবস্ত করা দরকার।

১০. বিকল্প কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ: হকারদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠা ইকোনমিক জোনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি দেশের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে ঢাকামুখী দরিদ্র লোকদের অভিগমন রোধ করতে হবে।