যার বাড়িতে চুরিকে কেন্দ্র করে পিটিয়ে হত্যা, তাকেই ছেড়ে দিল পুলিশ

রাজধানীর উত্তরায় বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসায় চুরির অভিযোগে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। সেই সঙ্গে আরও দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরের আলাউল এভিনিউ সড়কের পোস্টাল কোয়ার্টার্সে বুধবার (১৯ আগস্ট) বেলা ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত এমন অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
পরবর্তীতে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মো. আব্দুল জব্বার (৭০) নামের একজনকে অচেতন এবং মো. কামাল হোসেন (৫৪) ও মো. ইদ্রিস আলী সেলিম (৫৬) দুজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক আব্দুল জব্বারকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আব্দুল জব্বার পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার সাবুপুর গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে। আহতরা হলেন কুমিল্লার লাকসাম থানাধীন জগতপুর গ্রামের মৃত মো. সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. কামাল হোসেন এবং লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানাধীন পাঁচপাড়া গ্রামের মৃত মাহমুদ উল্লাহর ছেলে ইদ্রিস আলী সেলিম।
নিহত জব্বার বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান, আহত কামাল সাভারের কলাতিয়া পাড়া শ্যামলাশি এবং ইদ্রিস মতিঝিলের কমলাপুর রেললাইন বস্তিতে থাকেন।
জানা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. মহিউদ্দিন ও রাজশাহীর পোস্টাল একাডেমির প্রশিক্ষক মৌসুমী আক্তার দম্পতির পোস্টাল কোয়ার্টার্সের ফ্ল্যাটে গত ছয় মাস আগে চুরির ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা করেন তারা। মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে তদন্তাধীন রয়েছে। মৌসুমী বর্তমানে ঢাকার সঞ্চয় শাখা ও অতিরিক্ত পিএলআই শাখায় সংযুক্ত রয়েছেন।
সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও ঘটনার সময়ের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজনকে কোয়ার্টারের সামনের রাস্তা থেকে জব্বার, কামাল হোসেন ও ইদ্রিস আলী সেলিমকে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে রশি দিয়ে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে কোয়ার্টারে ঢোকানো হয়। তারপর পোস্টাল কোয়ার্টার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সামনে রাস্তার পাশে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে বাঁধা অবস্থাতেই সেখানে অচেতন হয়ে পড়েন জব্বার। ওই সময় বিমান কর্মকর্তা মহিউদ্দিনকেও ঘটনাস্থলে দেখা যায়।
পরবর্তীতে পুলিশ খবর পেয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে একজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে বিমান কর্মকর্তা মহিউদ্দিনসহ পাঁচজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। যদিও মহিউদ্দিন ও তার স্ত্রী মৌসুমীর ক্ষমতার দাপটের কারণে মহিউদ্দিনকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।
পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিহতের মেয়ে বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ৭/৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ওই পোস্টাল কোয়ার্টারে গিয়ে কথা হয় সেখানকার নিরাপত্তাকর্মী মাহবুব হাসানের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, সন্দেহজনক তিন চোর ধরেছিল লোকজন। পরে পুলিশ এসে ওই তিনজন চোরকে নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে আমাদের সাইদুল, রোকন ও সামিউল নামের একজন নিরাপত্তাকর্মী ও দুজন গাড়িচালককে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ।
মহিউদ্দিনকে আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব হাসান বলেন, আগে প্রথম তিনজনকে নিয়ে যায়, পরে আবার মহিউদ্দিন সাহেবকে নিয়ে যায় পুলিশ।
মোহাম্মদ হেমায়েত নামের ওই কোয়ার্টারের আরেক বাসিন্দা এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি শুনতে পেয়েছি, চোর ধরার পর গণপিটুনি দিয়েছে। তারপর একজন মারা গেছে বলেও শুনেছি।
এদিকে সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে কোয়ার্টারের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে কোয়ার্টার থেকে সাংবাদিককে বের করে মূল গেট লাগিয়ে দেন নিরাপত্তাকর্মী।
অপরদিকে উত্তরা পূর্ব থানায় গিয়ে দেখা যায়, আহত, নিহত ও আটক ব্যক্তিদের স্বজনদের ভিড়। এদের মধ্যে মুনমুন নাহার হলেন আটক হওয়া কোয়ার্টারের সাধারণ সম্পাদক রুকুনের স্ত্রী। মুনমুন নাহার এশিয়া পোস্টকে বলেন, এক বছর আগে তাঁদের (মহিউদ্দিন ও মৌসুমী) বাসায় চুরিটা হয়। এদিকে কোয়ার্টারের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় কিছু হলেই আমার স্বামীকেও তদারকি করতে হয়।
তিনি বলেন, একটা চোর আসলে সবাই ধরে, এমন করে। ওনাদের (মহিউদ্দিন ও মৌসুমী) আদেশেই ওই সিকিউরিটি যেমন বলছে, তেমনটা করছে। ঘটনার সময় ওনার (মৌসুমীর) স্বামীও সেখানে ছিল, আমার স্বামীও ছিল। কিন্তু তাঁকে (মহিউদ্দিন) ছেড়ে দিল। তিনিও গভর্নমেন্ট জব করেন, আমার স্বামীও গভর্নমেন্ট জব করেন। তাহলে তাঁকে ছেড়ে দিল কি পদের কারণে?
মুনমুন বলেন, চোর গণপিটুনিতে মরলে ওনাদের কী? পার্সোনালভাবে কি কারও কিছু আসে যায়? কেউ কি উদ্দেশ্য নিয়ে কাউকে মারে?

হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. মহিউদ্দিন প্রথমে এশিয়া পোস্টকে থানা থেকে তথ্য নেওয়ার জন্য বলেন। পরে তাকে আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, ওই সময় আমি অফিসে ছিলাম। শুনলাম তিনজনকে আটক করা হয়েছে। পরে আমি ডিবি পুলিশকে ফোন দিই। পরে আমি গিয়ে দেখি, সেখানে পুলিশ ঘটনাস্থলে রয়েছে। পুলিশ তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে গেলে একজন মারা যায়।
মহিউদ্দিন বলেন, আমরা যাওয়ার আগেই সেখানে পুলিশ ছিল। আমি পুলিশের বাইরে কিছুই করিনি।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রসঙ্গে ডিএমপির উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোর্শেদ আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, একটি ফোনের মাধ্যমে জানতে পারি তিনজন চোরকে পোস্টাল কোয়ার্টারে আটকানো হয়েছে। তারা সন্দেহজনক আসামি। তখন আমি তাদের বলি, চোর আটকাইছেন ভালো কথা, কিন্তু মারপিট করেন না। আমি দ্রুত টিম পাঠাচ্ছি।
তিনি বলেন, পরে এসআই আশরাফ ঘটনাস্থলে গিয়ে জানায়, একটা চোরের অবস্থা খুবই খারাপ। মুখ দিয়ে লালা পড়তেছে, অজ্ঞান অবস্থায় আছে, গাছের সঙ্গে ওরা বেঁধে রাখছে। পরে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক জানায়, মারা গেছে।
‘বিষয়টি এডিসি ও ডিসি স্যারকে জানাই এবং দ্রুত হাসপাতালে যাই। সেখান থেকে দারোয়ান সাইদুলকে আটক করে ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার সব আলামত পাই।’
তখন সাইদুল বলেছিল, ২০২৫ সালে ম্যাডামের বাসায় চুরি হয়েছিল, যার কারণে আমরা চোরকে ধরে রাখি। মারধরের বিষয়ে সাইদুল জানায়, অনেক লোকজন ছিল। বিভিন্ন লোক বিভিন্নভাবে মারধর করছে।
ওসি বলেন, সিসি ফুটেজে তারা যে লাঠিসোঁটা নিয়ে মারধর করতেছে, সেটা দেখলাম। ড্রাইভার রোকন, সাইদুল ও সামিউলকে ক্লিয়ার বোঝা যাচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। পরে তাদের আটক করা হয়।
বিমান কর্মকর্তা মহিউদ্দিনকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে ওসি মোর্শেদ আলম থানায় নিয়ে আসার বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেন, ওনার সঙ্গে আমরা ৭/৮ জনকে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসছিলাম। ডিসি স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে, ওনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
ওসি মোর্শেদ বলেন, যে মারা গেছে, তার বিরুদ্ধে একটি মামলা আছে। বাকি দুজনের বিরুদ্ধে দুটি করে মামলা আছে।
অপরদিকে উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মির্জা তারেক আহমেদ বেগ এশিয়া পোস্টকে বলেন, গত বছর একটি বাসায় চুরি হয়েছিল। যার সিসিটিভি ফুটেজ ছিল। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কয়েকজনকে ধরে মারধর করছে। এতে তিনজনের মধ্যে একজন মারা যায়। দুজনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় যিনি মারা গেছেন, তার মেয়ে বাদী হয়ে চারজনের নামে মামলা করেছে। আরও ৭/৮ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা নিজেরাই জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। আবার ঘটনাস্থল থেকে লাঠি ও দড়ি উদ্ধার করা হয়েছে।
বিমান কর্মকর্তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা তারেক বলেন, কাউকে ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রাথমিকভাবে যাদের পেয়েছি, তাদের নিয়ে আসছি। তদন্তে যাঁদের নাম বেরিয়ে আসবে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।




