দক্ষিণখানে সশস্ত্র কিশোরগ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মহড়া-মারামারি

রাজধানীর দক্ষিণখানে মাদক কারবারের দ্বন্দ্বের জের ধরে কিশোরগ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে অস্ত্রসজ্জিত মহড়া-মারামারি হয়েছে। যার কারণে এলাকাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ আগস্ট) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত দক্ষিণখানের মুক্তিযোদ্ধা রোড এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা আতাউর রহমানের বাড়ির গলিতে এ মহড়া চলে। পরবর্তীতে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
শুক্রবার (৪ আগস্ট) সকাল থেকে আবার দেশীয় অস্ত্রসস্ত্রসহ সজ্জিত হয়ে মহড়া শুরু হয়েছে। ওই এলাকার একাধিক বাসিন্দা এশিয়া পোস্টকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাসিন্দা জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরে মাদক কারবার নিয়ে দুই কিশোরগ্যাং গ্রুপের দ্বন্দ্ব চলছে। যার ফলে ইতোমধ্যে কয়েকবার হামলা ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
তারা বলেন, দক্ষিণখানের ৫০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও মধ্যআজমপুর কমিউনিটি পুলিশের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ওই এলাকার ময়লা ও ডিস ব্যবসা। আর তার ছেলে অনুর নিয়ন্ত্রণে মাদক ব্যবসা। সেই সঙ্গে অনুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে একটি কিশোরগ্যাং গ্রুপও।
ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণের জের ধরেই অনুর সঙ্গে আরেক কিশোরগ্যাং লিডার ফরহাদ, মসলা মামুনের সঙ্গে দক্ষিণখানের দফায় দফায় সংঘর্ষ, হামলা ও মামলা চলমান রয়েছে। যার কারণেই মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট এলাকায় রাতভর, দিনভর কিশোরগ্যাং ও মাদক কারবারিদের আনাগোনা। সেই সঙ্গে একের পর হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা রোডের মুসলিম পাড়ার রোডের মাথার সামনে একটি কিশোরগ্যাং গ্রুপ, আরেকটি গ্রুপ নূর মসজিদের সামনে। দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়া চলছে। সবার হাতেই ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা।
সরেজমিনে রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় বিএনপি নেতার বাসার পাশের একটি পরিত্যক্ত একতলা ভবনের ছাদে কিশোরগ্যাংয়ের অস্ত্রধারী সদস্যরা অবস্থান করছে। পরবর্তীতে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা টিনের চালের উপর দিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে একজন বিএনপি নেতা আতাউর রহমানের বাড়ির ছাদে উঠে সিঁড়ির গেটের তালা লাগিয়ে দেয়। পরে ওই বাড়িতে পুলিশ গিয়েও ছাদে উঠতে পারেনি।
পরিত্যক্ত ভবনটির সঙ্গে নিচতলা টিনশেড ভবনের টয়লেটের সামনে ও ভেতরে ইটপাটকেল পড়ে দেখা যায়। এলাকার বাসিন্দারা জানায়, হামলার শিকার হয়ে এক সদস্য টয়লেটে আশ্রয় নিয়েছিল। পরে আরেক গ্রুপের সদস্যরা তাকে মারার জন্য ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলার চেষ্টা করে। ওই সময় টয়লেটের একটি দরজায় কোপানো ও লাঠিসোঁটা দিয়ে হামলার চিহ্ন পাওয়া যায়। সেখানে কিশোরগ্যাংয়ের একটি চাপাতিও পড়ে ছিল।
বিএনপির আতাউর রহমানের বাড়ির পাশের রোডের নৈশপ্রহরী আজিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি ডিউটি অবস্থায় দেখি ১০-১৫ জন পোলাপান হাতে চাপাতি, দা নিয়ে দৌঁড়াদৌঁড়ি করে ঢুকছে। ছাদের উপরের লোকজন কারা, সেটি বলতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, তারপর ওই পাশ থেকে বিকট শব্দ পেয়েছি। পরে ওই দিকে আমি যাই নাই। কারণ, ওই কাজ আমার না।
মুক্তিযোদ্ধা রোডের নৈশপ্রহরী মো. আব্দুল্লাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, রাত ১২টার পর অস্ত্রসহ পোলাপান ছোটাছুটি করছিল। এদের মধ্যে কিছু ছিল সরদার বাড়ি আর কিছু ছিল এই এলাকার। তিনি বলেন, মাদকের টাকা পয়সা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানতে পেরেছি।
এ ছাড়াও গভীর রাতে কিশোরগ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির অভিযোগ এলাকার বাসিন্দারের। কিন্তু গুলি করার কোন ছবি বা ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
মহড়া ও মারামারির পর ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হোন দক্ষিণখান থানার এএসআই ওমর ফারুক, একজন এসআই ও দুইজন পুলিশ কনস্টেবল। তারা এশিয়া পোস্টকে বলেন, মারামারির খবর পেয়ে এসেছি। কিন্তু কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
তারা আরও বলেন, আতাউর রহমানের বাড়ির ছাদে কয়েকজনকে দেখতে পেয়েছি। কিন্তু গেট তালা মারা ছিল, তাই ঢোকা যায়নি।
রাতের পর ফের সকাল ৮টা থেকে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ওই পরিত্যক্ত ভবনের সামনে কিশোরগ্যাংয়ের মহড়া হয়েছে। ওদের হাতেও ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা ছিল। এ ছাড়াও ওই ভবনের ছাদেই রাত দিন মাদকসেবন ও বিক্রি হয় বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এ বিষয়ে ডিএমপির দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফহিম উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, রাতে কিশোরগ্যাংয়ের মহড়া ও গণ্ডগোলের পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। সকালে আবার পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলের আশেপাশের সিসি টিভি ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করে কিশোরগ্যাংয়ের সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
অপরদিকে অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে দক্ষিণখানের ৫০নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও মধ্যআজমপুর কমিউনিটি পুলিশের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




