চাঁদাবাজির প্রমাণ থাকার পরেও মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিল পুলিশ

দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজধানীর রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সালাউদ্দিন আহমেদ শিপু ওরফে শিপু মোল্লাকে আটক করেছিল পুলিশ। তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা রয়েছে, থানায় একাধিক অভিযোগ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে। এমনকি নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার ভিডিও ফুটেজও রয়েছে। এরপরও তাকে আদালতে পাঠানো হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে রুপনগর থানা পুলিশ।
গত রোববার (২৩ আগস্ট) দিবাগত রাতে শিপু মোল্লাকে আটক করা হয়। পরে তাকে রূপনগর থানায় না রেখে মিরপুর মডেল থানার গারদে রাখা হয়। সেখানে আটকের ছবি ও ভিডিও প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। পরে সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের দাবি, শিপু মোল্লার বিরুদ্ধে ওই সময় কোনো সুস্পষ্ট মামলা বা অভিযোগ না থাকায় তাকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে নথিপত্র বলছে, তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা রয়েছে এবং রূপনগর থানাতেও একাধিক লিখিত অভিযোগ ও জিডি রয়েছে।
রূপনগর থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে শিপু মোল্লাকে আটক করা হয়েছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে মিরপুর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তাকে আটক করা হয়েছিল। পরে নিরাপত্তার কারণে মিরপুর মডেল থানায় রাখা হয়। নতুন করে মামলা বা অভিযোগ না করায় মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে শিপু মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগের নথি থাকার বিষয়টি জানানো হলে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি ওসিই ভালো বলতে পারবেন। এসব বিষয় ওসি স্যার নিজে ডিল করেন।
নির্মাণকাজ বন্ধের ঘটনায় আদালতে মামলা
ড্যাফোডিল হোমস লিমিটেডের একটি নির্মাণাধীন ভবনে গিয়ে পুলিশসহ কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শিপু মোল্লা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। গত ১৪ আগস্ট এশিয়া পোস্টে ‘পুলিশ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি নেতাদের চাঁদাবাজি’ শিরোনামে একটি সংবাদও প্রকাশিত হয়।
সেই সংবাদে বলা হয়– গত ১৮ জুলাই দুপুর ১২টা ৩ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে একটি নির্মাণাধীন বাড়ির সামনে গিয়ে ভেতরে কর্তব্যরত নির্মাণশ্রমিকদের গালমন্দ করতে থাকেন কয়েকজন। এ সময় পুলিশের দুজন সদস্যও তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সিসিটিভির ফুটেজে শোনা যায়, চাঁদা না দিলে উপস্থিত ব্যক্তিরা নির্মাণশ্রমিকদের কাজ বন্ধ করে চলে যাওয়ার জন্য বলছেন। চলে না গেলে শ্রমিকদের শাসাতে থাকেন। এরপর কাজ বন্ধ রাখতে বলে তারা সেখান থেকে চলে যান।
সিসিটিভির সেই ফুটেজের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে জানা যায়, এলাকাটি মিরপুরের রূপনগর থানাধীন দুয়ারীপাড়া এলাকার ‘ক’ ও ‘খ’ ব্লকে। সেখানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তের একটি নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানে নির্মাণকাজ চলছে। ডেফোডিল হোমস লিমিটেড নামের একটি ডেভেলপার কোম্পানি এই নির্মাণকাজের দায়িত্বে আছে।
জানা যায়, সেখানে যারা উপস্থিত হয়েছিলেন, তারা বিএনপি, শ্রমিক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী। পরে আরও খোঁজ নিলে তাদের বিস্তারিত পরিচয় মেলে। সেই দলে ছিলেন ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি জামাল ওরফে লম্বা জামাল, রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লা, ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী শিহাব উদ্দিন, রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মামুন, বিএনপি নেতা দুলাল ও আব্দুল হকসহ আরও বেশ কয়েকজন।
জানা গেছে, কোম্পানির মালিক আবদুল মান্নান এ ঘটনায় রূপনগর থানায় মামলা করতে একাধিকবার গেলেও মামলা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। পরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতে দায়ের করা ওই মামলার সিআর নম্বর ৫৮৭/২৬। মামলায় শিপু মোল্লাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া রূপনগর থানায় শিপু মোল্লার বিরুদ্ধে দায়ের করা অন্তত এক ডজন অভিযোগ ও জিডির নথি রয়েছে প্রতিবেদকের হাতে।
এ বিষয়ে শিপু মোল্লার বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যবহৃত নম্বরে কল দিলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
চাঁদা না দিলে নির্মাণে বাধা
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রূপনগরের দুয়ারীপাড়া এলাকায় জমি ও প্লট ঘিরে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয়। প্লট মালিকেরা স্থাপনা নির্মাণ শুরু করলে তাদের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া, শ্রমিকদের ভয়ভীতি দেখানো এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটেছে।
কয়েকটি ঘটনায় নির্মাণাধীন স্থাপনায় দলবল নিয়ে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ভিডিও ফুটেজও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন খালি জায়গা দখল করে সেগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে। জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের একাধিক প্লট নিয়েও দখলের অভিযোগ রয়েছে শিপু মোল্লা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।



