logo

কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধানসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের প্রধানসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা
জঙ্গিবাদ। প্রতীকী ছবি

নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রধান নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলায় কেএনএফের প্রধান নাথানা লনচেও ওরফে নাথান বম ছাড়াও মংহলাসিন মারমা ওরফে মং, নিয়াজ হায়দার, মো. গোলাম আজম, সাহেদুল ইসলাম, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, জামালুল ইসলাম, মো. তৌহিদুল ইসলাম ও মো. মতিউর রহমানকে আসামি করা হয়েছে।

বুধবার (৮ অক্টোবর) সিআইডি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বায়েজিদ বোস্তামী থানায় গত ৭ অক্টোবর মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাটির তদন্তে কেএনএফের আর্থিক উৎস, অর্থের প্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডি অনুসন্ধানে জানতে পারে, কেএনএফের জন্য ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির ফ্যাব্রিক ও সেলাইয়ের কাজ বাবদ মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফ্যাব্রিক তৈরির জন্য ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং ইউনিফর্ম সেলাইয়ের জন্য ৭২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়।

সিআইডির প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ১৮ মে। ওই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ২টার দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় কেএনএফের পোশাক প্রস্তুতের সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করা হয়।

আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে হালিশহর থানার ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে আটক করা হয়।

তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে মোট ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ কেএনএফ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং একটি কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। প্রতিটি সেটে ছিল একটি শার্ট ও একটি প্যান্ট। পরবর্তীতে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি।

সংস্থাটি শুধু ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে অর্থের উৎস, ব্যবহার এবং এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে অর্থ প্রবাহের তথ্য অনুসরণ করা হয়।

সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা ওরফে মংয়ের ভূমিকার তথ্য পাওয়া যায়।

সিআইডির দাবি, মংহলাসিন মারমা প্রথমে নিয়াজ হায়দারের সঙ্গে এবং পরবর্তীতে নিয়াজ হায়দারের মাধ্যমে গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক তৈরির ব্যবস্থা করেন।

সিআইডির অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মংহলাসিন মারমা নিজেকে এমআই এন্টারপ্রাইজের সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২০ নভেম্বর ২০২৪ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ দুটি পারচেজ অর্ডার দাখিল করেন। এসব কাজের বিপরীতে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে সিআইডি।

কেএনএফের ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের শার্ট ও প্যান্ট সেলাইয়ের জন্য মংহলাসিন মারমার নির্দেশনায় নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজম তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে অভিযোগ করেছে সিআইডি।

ইউনিফর্ম সেলাইয়ের কাজ বাবদ ওই তিন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় আরও ৭২ লাখ টাকা। সিআইডির আর্থিক অনুসন্ধানে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থের একটি ধারাবাহিক প্রবাহের তথ্য পাওয়া গেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাংক হিসাব, চেক ও নগদ অর্থের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ফ্যাব্রিক তৈরিতে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা, ইউনিফর্ম সেলাইয়ে ৭২ লাখ টাকা। সর্বমোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা।

সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নাথান বমের নির্দেশনায় মংহলাসিন মারমাসহ অন্য আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে কেএনএফের জন্য বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির উদ্যোগ ও অর্থায়ন করেছেন—এমন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

সংস্থাটির দাবি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, মামলাটির তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে কেএনএফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের জন্য অর্থের উৎস ও প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন, অর্থ প্রদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এই আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে।

মামলার তদন্তে আরও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে সিআইডি।