ল্যাপটপ-আইপ্যাড এনে মোটর পার্টস ঘোষণা, কর ফাঁকির চেষ্টা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক ফাঁকি দিতে ল্যাপটপ, আইপ্যাড এনে মোটর পার্টসের ঘোষণা দিয়েছে সরদার গ্লোবাল ট্রেড ও ফাহিম ফাইভ স্টার লিমিটেড নামের দুটি কোম্পানি। এ ঘটনায় ১ হাজার ১৫৭টি ল্যাপটপ ও ১০০ ট্যাব-আইপ্যাড জব্দ করা হয়েছে। এতে কোম্পানি দুটি ২ কোটি ৭ লাখ ২১ হাজার ৫৭০ টাকা শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গোয়েন্দা সদস্যরা জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইটে একই আমদানিকারকের দুটি চালানে বিপুলসংখ্যক ল্যাপটপ, ট্যাব ও আইপ্যাডসহ বিভিন্ন পণ্যে মিথ্যা ঘোষণা, অস্বাভাবিক কম মূল্য দেখানো এবং পণ্যের প্রকৃত অবস্থা গোপনের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। দুই চালানে ঘোষিত মূল্যের চেয়ে কাস্টমসের মূল্যায়ন প্রায় ৩০ গুণ বেশি হয়েছে।
তারা আরও জানান, চালান দুটির আমদানিকারক সরদার গ্লোবাল ট্রেড ও ফাহিম ফাইভ স্টার লিমিটেড নামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। দুটি চালানে মোট ১ হাজার ১৬৭টি ল্যাপটপ এবং ১০০টি ট্যাব ও আইপ্যাড পাওয়া গেছে। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ গাড়ির যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য পণ্যও রয়েছে।
প্রথম চালানটির এয়ারওয়ে বিল (এডব্লিউবি) নম্বর ৯৯৭-৬৬৮৯০৭৫১ এবং বিল অব এন্ট্রি (বি/ই) নম্বর ৮২১১৮৬। ১৩ আগস্টের ওই চালানে আমদানিকারক পণ্যের মূল্য ঘোষণা করেন মাত্র ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। তবে কায়িক পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পর এর মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৩ হাজার ৫২৭ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১ কোটি ২৭ লাখ ৮৫ হাজার ৫৮৪ টাকা।
কায়িক পরীক্ষায় প্রথম চালানে ৫৪৩টি ‘HP Core i5’ এবং ১৮৭টি ‘HP Core i3’ ল্যাপটপ পাওয়া যায়। এ ছাড়া মিনি পিসি হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরীক্ষায় আরও ১০টি ‘HP Core i5’ ল্যাপটপ পাওয়া যায়। পাশাপাশি ৫৫টি ট্যাব ও পাঁচটি আইপ্যাড পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এ চালানে ৭৪০টি ল্যাপটপ এবং ৬০টি ট্যাব-আইপ্যাড রয়েছে। ঘোষণার সঙ্গে তুলনায় অতিরিক্ত ৪৩টি ল্যাপটপ পাওয়ার বিষয়টিও পরীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় চালানটির এডব্লিউবি নম্বর ৯৯৭-৬০৫০০৪৫১ এবং বি/ই নম্বর ৮২১১০৮। এ চালানে ঘোষিত মূল্য ছিল মাত্র ২ হাজার মার্কিন ডলার। কায়িক পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পর চালানটির মূল্য দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ২৫৯ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ৯৮৬ টাকা।
এই চালানে ৪৬টি ‘Core i3’ ও ৩৮১টি ‘Core i5’ মোট ৪২৭টি ল্যাপটপ পাওয়া যায়। এর সঙ্গে ছিল ৩৫টি ট্যাব ও পাঁচটি আইপ্যাড। ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত ৩৯টি ল্যাপটপ পাওয়ার কথাও পরীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই চালান মিলিয়ে আমদানিকারক পণ্যের মূল্য ঘোষণা করেছিলেন ৫ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু কায়িক পরীক্ষা ও মূল্যায়নের পর সম্মিলিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৮৬ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ কোটি ৭ লাখ ২১ হাজার ৫৭০ টাকা। অর্থাৎ ঘোষিত মূল্যের তুলনায় কাস্টমসের মূল্যায়ন প্রায় ৩০ দশমিক ৫ গুণ বেশি।
সিআইআইডির পরীক্ষণ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া ল্যাপটপের বাহ্যিক অবস্থা দেখে সেগুলো ব্যবহৃত বলে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতিবেদনে এসব পণ্যের ক্ষেত্রে ‘কুড বি ইউজড অ্যাজ পার এক্সটার্নাল অ্যাপিয়ারেন্স’ মন্তব্য করা হয়েছে। কাস্টমস গোয়েন্দাদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যবহৃত এসব পণ্য প্রচলিত আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী আমদানি-নিষিদ্ধ পণ্যের আওতায় পড়ে।
এ ছাড়া ক্যাপাসিটার, রাবার সিল ও-রিং, গ্যাসকেট রাবার ও ফিটিংস নামে ঘোষণা করা কিছু পণ্য পরীক্ষায় গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে ঘোষিত পণ্যের বর্ণনা ও সংশ্লিষ্ট এইচএস কোড পরিবর্তনের বিষয়টিও পরীক্ষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সিআইআইডি জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ১৩ আগস্ট চালান দুটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পরে ২৩ আগস্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে চালান দুটির কায়িক পরীক্ষা করা হয়।
মিথ্যা ঘোষণা, অস্বাভাবিক কম মূল্য ঘোষণা, ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য, পণ্যের প্রকৃত বর্ণনা গোপন এবং আমদানি-নিষিদ্ধ ব্যবহৃত পণ্য আমদানির অভিযোগে কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং প্রযোজ্য আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, মিথ্যা ঘোষণা, শুল্ক-কর ফাঁকি এবং নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।




