logo
Advertisement

ফ্ল্যাট পাচ্ছে কড়াইলসহ ৩ বস্তির ৩৩ হাজার পরিবার, চীনা অর্থায়নের আশা

লতিফুল ইসলাম
ফ্ল্যাট পাচ্ছে কড়াইলসহ ৩ বস্তির ৩৩ হাজার পরিবার, চীনা অর্থায়নের আশা
কড়াইল বস্তি। ছবি: উইকিপিডিয়া

বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট পেতে যাচ্ছে রাজধানীর তিন বস্তিবাসী। কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তির ৩৩ হাজারেরও বেশি পরিবারকে এসব ফ্ল্যাট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে আধুনিক আবাসন গড়তে চীনের কাছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বেইজিংয়ের তরফেও বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

Advertisement

পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন বস্তির বর্তমান পরিস্থিতি, বাসিন্দাদের আর্থসামাজিক অবস্থা ও জমির মালিকানা খতিয়ে দেখে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

সচিবালয়ে গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এ সময় তিনি মন্ত্রীকে ঢাকার দেওয়া প্রস্তাবটি বিবেচনার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। পরে বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত জানান এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গুলশান ও ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তির বাসিন্দাদের জন্য আধুনিক আবাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার বিভাগে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবটি চীনের কাছে পাঠানো হয়েছে। তারা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা প্রস্তাবটি বিবেচনা করবেন। পুরো অর্থায়ন একসঙ্গে সম্ভব না হলে অগ্রাধিকার অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’

সমীক্ষা-মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শুরু

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই একক উৎস পদ্ধতিতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানিকে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকার কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৩ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সই হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ২ ডিসেম্বরের মধ্যে সমীক্ষা ও মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ শেষ করতে হবে। এতে ডিএনসিসির পক্ষে স্বাক্ষর করেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফারুক হাসান মো. আল মাসুদ।

দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তিতে মোট ৩৩ হাজার ৫৯টি পরিবার বসবাস করছে, যার মধ্যে ২৫ হাজার ৩২৮টি পরিবার পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি পরিবার কড়াইলে—১৬ হাজার ৬৫টি। ভাসানটেকে ১০ হাজার ২৮৭টি এবং সাততলায় ৬ হাজার ৭০৭টি পরিবারের বসবাস।

তিন বস্তির মোট আয়তন প্রায় ২১৮ একর। এর মধ্যে গুলশান, বনানী ও মহাখালীজুড়ে বিস্তৃত কড়াইলের আয়তন ৯২ একর, মহাখালীর সাততলা বস্তির ২৬ একর এবং ভাসানটেক বাজার, ধামালকোট ও টেকপাড়া এলাকার ভাসানটেক বস্তি প্রায় ১০০ একর। তিন বস্তিই পড়েছে ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনে।

জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহারে বহুতল ভবন

ডিএনসিসির নথি অনুযায়ী, তিন বস্তির বাসস্থানের অবস্থা নাজুক। সরু সড়ক ও গলির কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়, পাশাপাশি পর্যাপ্ত ড্রেনেজ, স্যানিটেশন, নিরাপদ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত কমিউনিটি অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। সমীক্ষায় এসব সমস্যার পাশাপাশি বাসস্থানের চাহিদা, নাগরিক সেবার ঘাটতি, জমির ব্যবহার, পরিবেশগত ঝুঁকি, সাময়িক স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তা এবং বাসিন্দাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হবে।

ডিএনসিসির নগর পরিকল্পনাবিদ রেমোন আহমেদ আসিফ বলেন, ‘এসব বস্তির বর্তমান জীবনযাত্রা স্বাস্থ্যকর বসবাসের উপযোগী নয়। প্রকল্পের মাধ্যমে বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, স্যানিটেশনসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রয়োজন হবে। এতে মসজিদ, বাজার, কমিউনিটি সেন্টারসহ অন্যান্য সাধারণ সুবিধার জন্য জায়গা রাখা সম্ভব হবে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বাসিন্দাদের মালিকানা বা ভাড়াভিত্তিক আবাসন মডেল এবং উন্নয়ন ব্যয়ের বিস্তারিত প্রস্তাব দেবে।’

৬০০-৬৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, গুনতে হবে না ভাড়া

সরকারের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ তলা ভবনে ৬০০ থেকে ৬৫০ বর্গফুট আয়তনের আবাসিক ইউনিট নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে বস্তিতে বসবাসরত পরিবারগুলোকে পর্যায়ক্রমে এসব ভবনে পুনর্বাসন করা হবে। তাদের মাসিক ভাড়া দিতে হবে না। তবে বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি সেবার খরচ বহন করতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘বর্তমানে বস্তিতে বসবাসকারী কেউ যাতে বাদ না পড়েন, সেজন্য তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সবাইকে প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। তবে চীনের অর্থায়ন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তারা প্রস্তাবটি বিবেচনা করছে। অর্থায়ন নিশ্চিত হলে বিস্তারিত কাঠামো, ভবনের সংখ্যা ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয় নির্ধারণ করা হবে।’

থাকবে স্কুল-কলেজ, বাজার

বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক সুবিধা রাখার কথাও পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সমীক্ষায় শপিং মল ও বাজার, রেস্তোরাঁ, মসজিদ ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনা, চিকিৎসাকেন্দ্র, কলেজ, স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র এবং বর্জ্য সংগ্রহের স্থান রাখার সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।

অভ্যন্তরীণ সড়ক, পথচারী চলাচলের ব্যবস্থা, সড়ক ও নিরাপত্তাবাতি, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য সংগ্রহ এবং পার্ক ও সবুজ স্থান তৈরির প্রস্তাবও থাকবে। এলাকায় অপরাধ ও সহিংসতা কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পর্কেও সুপারিশ দিতে হবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে।

যাচাই করা হবে আর্থসামাজিক অবস্থা

মাস্টারপ্ল্যান তৈরির আগে প্রতিটি বস্তির বাসিন্দাদের আর্থসামাজিক প্রোফাইল তৈরি করা হবে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়, পেশা, বর্তমান আবাসন পরিস্থিতি এবং কত বছর ধরে তারা সেখানে বসবাস করছেন—এসব তথ্য সংগ্রহ করা হবে। বাসিন্দাদের দাবির সত্যতাও যাচাই করা হবে।

জমির মালিকানা, আইনগত ও নীতিগত বিষয়, উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিবিধান, নির্মাণমান, পরিকল্পনা কোড এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিশ্লেষণ করা হবে। কোথাও স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে তার পদ্ধতি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি বস্তির জায়গায় বসবাসরত মানুষকে রেখেই উন্নয়ন সম্ভব কি না সেটিও যাচাই করা হবে।

রেমোন আহমেদ আসিফ বলেন, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট জমির মালিকানা তিন থেকে চারটি সরকারি সংস্থার হাতে রয়েছে। পুনঃউন্নয়নের জন্য এসব জমি ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তর করা হবে।

অগ্নিঝুঁকি কমাবে বহুতল আবাসন পরিকল্পনা

বস্তির বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘনবসতি ও নাগরিক সুবিধার ঘাটতির মধ্যে তাদের বসবাস করতে হচ্ছে। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ডের সময় সরু রাস্তার কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে না পারায় বিপদের ঝুঁকি বাড়ে।

কড়াইলের বউবাজার এলাকার বাসিন্দা শাদাত হোসাইনের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। পেশায় রিকশাচালক শাদাত ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে সেখানে থাকেন। তিনি জানান, তাদের এলাকায় মাঝেমধ্যেই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কিন্তু রাস্তা এতো সরু যে, আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি অনেক সময় ভেতরে ঢুকতে পারে না।

ডিএনসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সমীক্ষা শেষ হওয়ার পর তিন বস্তির জন্য বাস্তবসম্মত ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। সেই পরিকল্পনায় বর্তমান বাসিন্দাদের আবাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি নাগরিক সুবিধা, পরিবেশ ও দুর্যোগঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পুরো এলাকার পুনঃউন্নয়নের কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।