এনসিপির ‘অবরুদ্ধ সময়ের কবিতা’

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বিকল্প বয়ান তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন কবি, লেখক, নাট্যকার ও সংস্কৃতিজনেরা।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর পরিবাগে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাহিত্য ও সংস্কৃতি সেলের উদ্যোগে ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ শীর্ষক মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘অবরুদ্ধ সময়ের স্মৃতি ও কবিতা’ নামের স্মৃতিচারণ ও কবিতাপাঠের আসরে বক্তারা এই আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ও কোষাধ্যক্ষ এস এম সাইফ মোস্তাফিজ। এ ছাড়া স্বাগত বক্তব্য দেন গণঅভ্যুত্থানের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও স্লোগান রচয়িতা এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব লুৎফর রহমান। এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য কবি সাইয়েদ জামিলের পরিচালনায় এবং কবি আহমেদ ইসহাকের সঞ্চালনায় এতে কবিতা পাঠ ও জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ করেন কবি জাকির আবু জাফর, সালাহ উদ্দিন শুভ্র, রাসেল রায়হান, সাম্য শাহ, সানাউল্লাহ সাগর, মামুন সারোয়ার, গাজী রফিক, আসমা সুলতানা শাপলা, আবিদ আজম, শিবলী আহমেদ, ইমরান মাহফুজ, জিয়া হক প্রমুখ। জুলাইয়ের স্বরচিত সংগীত ও কবিতা পরিবেশন করেন আমিরুল মোমেনীন মানিক।
স্বাগত বক্তব্যে সংস্কৃতিকর্মী লুৎফর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের শুরুর দিনগুলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৪ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যখন শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, তখন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম, হাসিব আল ইসলাম ও রিফাত রশিদসহ অন্য নেতারা চানখাঁরপুলের ‘স্বপ্ন বিল্ডিং’-এ বসে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করছিলেন।
লুৎফর রহমান বলেন, আন্দোলনের পোস্টার ও কর্মসূচির খরচ জোগাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা সংগ্রহ করতেন। ওই রাতে বাইকের তেল ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য আবু বাকের মজুমদার এবং নাহিদ ইসলাম তার কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিয়েছিলেন, যা ছিল আন্দোলনের অন্যতম প্রাথমিক তহবিল।
বক্তব্যে লুৎফর রহমান গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা দুটি বিখ্যাত স্লোগানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারো বাপের না’ স্লোগানটি তিনি নিজেই রচনা করেছিলেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিগত সরকারের পরিবারতান্ত্রিক বয়ান এবং ‘স্বজন হারানোর বেদনা’ দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদ করা।
অনুষ্ঠানের মূল আলোচনায় এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজ বিগত সরকারের দীর্ঘ ১৭ বছরের ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কেবল শাসন কাঠামোর মধ্যেই ফ্যাসিবাদ সীমাবদ্ধ রাখেনি, তারা শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিটি স্তরেও একটি সুনির্দিষ্ট ফ্যাসিস্ট কাঠামো গড়ে তুলেছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি শিশুদের জন্য প্রকাশিত ‘মুজিব’ কমিকসের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেখানে রাজনৈতিক চরিত্রকে অতিপ্রাকৃতিক বা সুপারহিরোর মতো উপস্থাপন করে কোমলমতি শিশুদের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। একইভাবে ‘জয় বাংলা কনসার্ট’-এর চিন্তাধারার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাইয়ের চেষ্টা করা হতো।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তা ও শ্রোতারা একমত হন যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের সাংস্কৃতিক ও মননশীলতার রূপান্তর অপরিহার্য। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে রক্ষা করতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারবিরোধী একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তুলতে হবে।
