logo
Advertisement

পল্লবীতে নিরাপত্তাকর্মী অপহরণ হননি, দাবি পুলিশের

এআই প্রতিবেদক
পল্লবীতে নিরাপত্তাকর্মী অপহরণ হননি, দাবি পুলিশের
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মো. মোস্তাক সরকার, ইনসেটে অপহরণের চিত্র এবং উদ্ধার হওয়া নিপাত্তাকর্মী ও গ্রেপ্তার হওয়া তার সহযোগী। কোলাজ ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাজধানীর পল্লবীতে মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম নামে এক নিরাপত্তাকর্মীকে সাদা বস্তায় ভরে অপরহণ করা হয়েছে দাবিতে ছড়ানোর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের দাবি, ওই নিরাপত্তাকর্মীকে কেউ অপহরণ করেননি। তিনি বিভিন্ন কারণে আর্থিক সংকটে ছিলেন। এজন্য তিনি আত্মগোপনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক সহযোগীর মাধ্যমে অপহরণের নাটক সাজান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) কার্যালয়ে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার জানান, তদন্তের ধারাবাহিকতায় সোমবার সকালে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি মাছ ধরার জাহাজে অভিযান চালিয়ে নজরুলকে উদ্ধার করা হয়েছে। তার সহযোগী হাসান তারেক ওরফে রিপনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিসি মোস্তাক সরকার জানান, নজরুল টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার বেকার কোনা গ্রামের শুকুর আলীর ছেলে। তিনি পল্লবীর এভিনিউ-২, ব্লক-এ এলাকায় দি স্যালভেশন আর্মি যক্ষা ও কুষ্ঠ ক্লিনিকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে প্রায় ১৬–১৭ বছর ধরে কাজ করছেন। তার মাসিক বেতন প্রায় ১৭ হাজার টাকা। পাশাপাশি মেসে থাকা লোকজনের রান্নার কাজও করতেন তিনি।

ডিসি বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নজরুল নাইট গার্ডের দায়িত্বে যোগ দেন। পরদিন তাকে কর্মস্থলে না পাওয়ায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। পরে একটি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ফুটেজে দেখা যায়, গত শুক্রবার ভোর ৪টা ৪৭ মিনিটের দিকে এক ব্যক্তি সাদা বস্তায় করে নজরুলকে মেইন গেটের সামনে নিয়ে আসছেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর, ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে নজরুল নিজেই বস্তা থেকে বের হয়ে গেটের সামনে বসেন। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে রিকশায় করে সেখান থেকে চলে যান। ফুটেজে দৃশ্যমান কোনো জোর জবরদস্তি দেখা যায়নি। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তদন্তে নামে পুলিশ।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, নজরুলের দুই স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। দুই পরিবারই টাঙ্গাইলে থাকে। ১৭ হাজার টাকা বেতন থেকে তিনি দুই পরিবারকে মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে মোট ৬ হাজার টাকা দিতেন। বাকি টাকা থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন।

মোস্তাক সরকার বলেন, সম্প্রতি পারিবারিক বিষয় নিয়ে প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে নজরুল আত্মহত্যার কথা বলেছিলেন বলে পুলিশকে জানান তাঁর স্ত্রী। পরে আত্মহত্যার চিন্তা বাদ দিয়ে পরিবার ও আর্থিক সংকট থেকে দূরে থাকতে আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মেসে থাকা চাচাতো ভাইয়ের ছেলে রিপনের সহযোগিতা নেন নজরুল। ঘটনার দিন ভোরে রিপন একটি সাদা বস্তায় নজরুলের কাপড় চোপড়ের ব্যাগ নিয়ে গার্ড রুমে প্রবেশ করেন। পরে নজরুল নিজেই ওই বস্তার মধ্যে ঢোকেন। রিপন তাকে বস্তাসহ মেইন গেটের কাছে নিয়ে যান। সেখান থেকে তারা অটোরিকশায় গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে যান।

পরে গাবতলী থেকে শ্যামলী পরিবহনের বাসে চট্টগ্রামের একে খান এলাকায় যান নজরুল। সেখানে ‘রাসেল’ নামের এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্ণফুলীর ইছানগর এলাকায় তাঁর বাসায় অবস্থান করেন। পরে রাসেলের মাধ্যমে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি মাছ ধরার জাহাজে বাবুর্চির কাজ নেন। সেখান থেকেই সোমবার সকালে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে নজরুলের আর্থিক সংকটের বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ এবং সুদের টাকা মিলিয়ে তার প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা দেনা রয়েছে। কিছুদিন আগে দ্বিতীয় ঘরের মেয়ের বিয়ের জন্যও ঋণ করেছিলেন তিনি। তার ছেলে রিফাত পুলিশকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি তার বাবা একটি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।

ডিসি মোস্তাক বলেন, দুই পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের বিয়ে এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও পারিবারিক সংকটে ছিলেন নজরুল।

তিনি বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নজরুলের ঘটনাটি প্রকৃত অপহরণ নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত আত্মগোপন এবং কথিত অপহরণ নাটক বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।