logo
Advertisement

৫ লাখ টাকার লোভে বাসযাত্রীকে হত্যা: চালক-সুপারভাইজার-হেলপার গ্রেপ্তার

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
৫ লাখ টাকার লোভে বাসযাত্রীকে হত্যা: চালক-সুপারভাইজার-হেলপার গ্রেপ্তার
রাজ ক্লাসিক পরিবহনের জব্দকৃত বাস ও গ্রেপ্তার তিন আসামি। ছবি: ডিএমপি

রাজধানীর বনানীতে যাত্রীবাহী বাসের মধ্যে এক ব্যক্তিকে শ্বাসরোধে হত্যার পর তার মরদেহ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বনানী থানা পুলিশ। জমি বিক্রি করে সঙ্গে থাকা প্রায় ৫ লাখ টাকার লোভেই ওই যাত্রীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

Advertisement

এ ঘটনায় বাসচালকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—বাসচালক সোহেল রানা (৪১), সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন (২৬) এবং হেলপার মো. মনির হোসেন (১৯)। তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গামছা, রক্তমাখা দুটি সিট কভারসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের বাসটিও জব্দ করেছে পুলিশ।

ডিএমপি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটে বনানী থানাধীন এয়ারপোর্টগামী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় এক ব্যক্তির মরদেহ পড়ে থাকার খবর আসে। খবর পেয়ে বনানী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে।

মরদেহটির মুখ ও দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে পেঁচানো ছিল। গলায়ও কালো দাগ দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করে, তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

প্রথমে নিহতের পরিচয় জানা না গেলেও ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ তার পরিচয় শনাক্ত করে। নিহতের নাম ইসমাইল হোসেন (৪৯)। পরে পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে ছবি দেখে তাকে শনাক্ত করেন।

এ ঘটনায় নিহতের ছেলে হাসান বাদী হয়ে বনানী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

জমি বিক্রির টাকা নিয়ে ঢাকার পথে

তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, ইসমাইল হোসেন জামালপুরের নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রি করে প্রায় ৫ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাচ্ছিলেন। তার গাজীপুরে যাওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সেখানে পৌঁছাননি।

ইসমাইলের ছেলে হাসান জিরানী বাসস্ট্যান্ডে বাবার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও তাঁর বাবা সেখানে না পৌঁছানোয় তিনি মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তখন ইসমাইলের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয় এবং শুরু হয় তদন্ত।

সিসিটিভিতে মিলল হত্যার সূত্র

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে বনানী থানা পুলিশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও আশপাশের এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা শুরু করে।

ফুটেজ বিশ্লেষণের একপর্যায়ে একটি যাত্রীবাহী বাসের চলাচল পুলিশের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। বাসটির গতিপথ অনুসরণ করে সেটি শনাক্ত করা হয় ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের একটি বাস হিসেবে।

এরপর বাসটির চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে পুলিশ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রথমে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন এবং হেলপার মো. মনির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পৃথক অভিযান চালিয়ে বাসচালক সোহেল রানাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

যেভাবে হত্যার পরিকল্পনা

পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার তিনজন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোর আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে জামালপুরের দিকপাইত বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসমাইল হোসেনকে যাত্রী হিসেবে বাসে তোলা হয়। বাসটি ঢাকার দিকে আসার পথে বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী ওঠানামা করতে থাকে।

একপর্যায়ে বাসের সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমন ইসমাইলের কাছে ভাড়া চান। ইসমাইল লুঙ্গির কোচর থেকে টাকা বের করে ভাড়া পরিশোধ করেন। এ সময় তাঁর কাছে আরও টাকা রয়েছে বলে ধারণা হয় সুপারভাইজারের।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি বাসচালক সোহেল রানাকে জানানো হলে তিনিও ইসমাইলের কাছে আরও টাকা থাকার কথা জানতে পারেন। এরপর তাঁরা ইসমাইলের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

অন্য যাত্রীদের নামিয়ে একা করা হয় ইসমাইলকে

পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাসটি চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছানোর পর ইসমাইলকে সেখানে নামানো হয়নি। বরং বাসের অন্যান্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়।

বাসে তখন ইসমাইলসহ অভিযুক্তরা ছাড়া আর কোনো যাত্রী না থাকার সুযোগে তাকে জিম্মি করা হয়।

পুলিশ জানায়, এরপর সুপারভাইজার ও হেলপার মিলে ইসমাইলের দুই হাত স্কচটেপ দিয়ে বেঁধে ফেলেন। পরে তার নাক-মুখও স্কচটেপ দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, শ্বাসরোধের মাধ্যমে ইসমাইলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার সঙ্গে থাকা টাকা নিয়ে নেয় অভিযুক্তরা।

ঢাকায় এনে এক্সপ্রেসওয়েতে ফেলে মরদেহ

হত্যার পর মরদেহটি বাসের ভেতরেই রাখা হয়। এরপর বাসটি ঢাকার দিকে আসে। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, বিমানবন্দর এলাকা দিয়ে বাসটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠে। পরে বনানীতে নেমে কাকলী মোড় হয়ে আবারও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠে।

এরপর কাকলী থেকে কুড়িলগামী অংশে ১৭৯ ও ১৮০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে ইসমাইল হোসেনের মরদেহ ফেলে রেখে যায় তারা। পরে বাসটি কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে মহাখালী বাস টার্মিনালে চলে যায়।

বাসেই মিলল হত্যার আলামত

অভিযানে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ‘রাজ ক্লাসিক’ পরিবহনের বাসটি জব্দ করা হয়েছে। বাসটি তল্লাশি করে পুলিশ দুটি গামছা, রক্তমাখা দুটি সিট কভার এবং একটি ফিচার মোবাইল ফোন জব্দ করেছে।

পুলিশ এসব আলামত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে তদন্তে ব্যবহার করছে।

আগেও মামলা ছিল দুই আসামির বিরুদ্ধে

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সুপারভাইজার সাজু ওরফে লিমনের বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি মামলা রয়েছে। বাসচালক সোহেল রানার বিরুদ্ধে দুটি ডাকাতি মামলা, দুটি মাদক মামলা এবং দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না এবং নিহতের কাছ থেকে নেওয়া পুরো টাকা উদ্ধার হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

এ ঘটনায় বনানী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই অব্যাহত রয়েছে।