পুলিশের সোর্স থেকে মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন ‘পিচ্চি রাজা’

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের এ ব্লকের ১৭৭ নম্বর ঘরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ২৭ বছর বয়সী যুবক মো. রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’। ১৯৯৯ সালে জন্ম নেওয়া এই তরুণ অপরাধ জগতে পা রাখেন কিশোর বয়সেই।
পুলিশ সূত্রের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালে ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সহযোগী হিসেবে অপরাধের খাতায় নাম লেখান তিনি। অপরাধের প্রাণকেন্দ্রখ্যাত জেনেভা ক্যাম্পে থাকার সুবাদে ওই সময় থেকেই পুলিশের তথ্যদাতা (সোর্স) হিসেবে কাজ শুরু করেন রাজা। মাঝে স্বল্প মেয়াদে একটি সিএনজি পাম্পে চাকরি করলেও তা হারিয়ে পুরোদমে ফের মাদকের কারবারে জড়িয়ে পড়েন।
২০১৮ সালে ৫১ পিস ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে প্রথমবার ধরা পড়েন রাজা। দুই মাস কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে নিজের নেটওয়ার্ক প্রসারিত করতে থাকেন। ২০২০ সালে গুরু ইশতিয়াক কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে ক্যাম্পের একচ্ছত্র মাদক কারবারের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে রাজার হাতে। একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে সরাসরি মাদকের চালানের রুট তৈরি করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জেনেভা ক্যাম্পের একক অধিপত্য ও মাদকের স্পট দখল নিয়ে বুনিয়া সোহেলসহ বিভিন্ন গ্রুপের সাথে রাজার বাহিনীর সহিংসতা শুরু হয়। বাজার ও লাইনম্যান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন প্রাণ হারান।
চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকা ফেরার পথে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তিনি জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্যাম্পের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে তোলার লড়াই থেকেই এসব হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
মাদক কারবারের পাশাপাশি বিপুল অবৈধ সম্পদের অভিযোগ রয়েছে রাজার বিরুদ্ধে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তার একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং মোহাম্মদপুর এলাকার সিএনজি অটোরিকশা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য তার একটি নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীও রয়েছে। রাজার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও বিস্ফোরকসহ ৩০টিরও বেশি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে কেবল মোহাম্মদপুর থানাতেই রয়েছে ২৫টি।
প্রিজন ভ্যান থেকে নাটকীয় পলায়ন
গ্রেপ্তারের পর থেকে কাশিমপুর কারাগারে থাকলেও গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আদালতে হাজিরা শেষে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন রাজা।
পুলিশি তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাঁতীবাজারের কাছে আগে থেকেই রাজার বোন ও আরেক নারী একটি প্রাইভেটকার নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। দায়িত্বরত এসআই প্রবীর কুমার নিজেই রাজাকে ওই গাড়িতে তুলে দেন। গাড়িটি কেটে পড়ার পর এসআই প্রবীর অন্য বাহনে গিয়ে গাজীপুরের বাইমাইলেই ফের প্রিজন ভ্যানে ওঠেন। ওই দিন রাজার বোনের সাথে এসআই প্রবীরের অন্তত ১৩ বার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ হয়।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এসআই প্রবীর ও গাড়িচালক কামাল হোসেনসহ ৫ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে এসআই প্রবীর, চালক কামাল এবং রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তার করে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। চালক কামালের বাসা থেকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা।
গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ মো. মিজানুর ইসলাম জানান, রাজাকে ভাগিয়ে নিতে কী পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয়েছে তা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা হবে।
সূত্র: আগামীর সময়
