logo
Advertisement

এভারকেয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
এভারকেয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এভারকেয়ার হাসপাতাল। ছবি : সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার এভার কেয়ার হাসপাতালে রোগী ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অস্বাভাবিক ও অসহযোগিতামূলক আচরণ এবং হাসপাতালটির বিভিন্ন ধরনের সেবার মান নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন সাংবাদিক ও সংবাদ উপস্থাপক জাফর সাদিক।

Advertisement

শুক্রবার (২১ আগস্ট) ফেসবুকে নিজের আইডিতে এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব অভিযোগের কথা তুলে ধরেন।

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এই বেসরকারি হাসপাতালটিতে তার ভগ্নিপতি ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচারের জন্য চিকিৎসাধীন আছেন। তার সঙ্গে অবস্থান করছেন তার বোন। তাদের সঙ্গে ঘটা নানা ঘটনা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

পোস্টে জাফর সাদিক লেখেন, ‘এভার কেয়ার হাসপাতাল ঢাকাকে ঢাকার শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল ধরা হয়। সেবায় নাকি তারা পাঁচ তারকা মানের! হাসপাতালের ভাবচক্কর, সেবাগ্রহীতাদের ঝাঁ-চকচকে সুরৎ (যদিও এখন আমার মতো গরীব-গোরাবারাও ওখানে সেবার জন্য যাচ্ছে) আর ডাক্তারদের মান নিঃসন্দেহে হাসপাতালটির প্রচারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি তাদের ওটি, আইসিউও সর্বাধুনিক। তাই টাকার খরচটাও বিশাল। কিন্তু চিকিৎসা ভালো হয় বলে ধারণা থেকে মানুষজন খরচ করতে দ্বিধা করে না।’

‘ওখানকার ম্যানেজমেন্ট এখন কারা চালায় জানি না। বাট এদের নার্সদের একাংশ এবং তাদের রোগী ব্যবস্থাপনার যে মান, তাতে এই হাসপাতালের সাথে ইমপালস বা ইবনে সিনার কোনো তফাৎ খুঁজে তো পাই-ইনি, উল্টো সেগুলো হয়তো কোনো ক্ষেত্রে আরো ভালো সেবা দেয় বলে মনে হয়েছে!’

তিনি বলেন, ‘আমার মেজ বোনজামাই ৭.৫ সেন্টিমিটারের একটা বিশাল ব্রেইন টিউমার অপারেশনের জন্য ওখানে ভর্তি হয়ে সার্জারির পর আপাতত স্ট্যাবল। বাট তার কন্ডিশন খুবই ক্রিটিক্যাল। সার্জারি সফল হলেও সে বাঁচবে কিনা গ্যারান্টি নেই। আইসিইউ থেকে তাকে বেডে দেওয়ার পর থেকে আমার বোন তার সাথে গত তিন দিন-তিন রাত টানা অবস্থান করছে। স্বামীর জন্য টেনশনে তার নাওয়া-খাওয়া হারাম দশা।’

দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অসহযোগিতার বিষয়ে এই সাংবাদিক বলেন, ‘আজ রাত ১১টার দিকে তার স্যানিটারি প্যাড দরকার হলে সে আমাকে নিচে গিয়ে নিয়ে আসতে বলে। কিন্তু ওয়ার্ড ও কেবিন ব্লকে রাতে বাইরের মানুষ যাতায়াত খুবই সীমিত। অনেক ঝক্কি, সব গেট বন্ধ থাকে, গার্ডদের নানা কথা বলে তারপর উঠতে হয়। তাই আমি ওকে বললাম, ডিউটি নার্স স্টেশনে গিয়ে বলে ওদের হাউজ কিপিংকে দিয়ে নিচ থেকে আনিয়ে নিতে। ও যাওয়ার পর ওকে মুখের ওপর না করে দিলো! আমি গিয়ে বেশ অনুরোধ করে জরুরি পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলার পরও আমাকে না তো করলোই, উল্টো উচ্চস্বরে নিজেরা নিজেরা কথা বলতে লাগল।’

‘আমি ওদের দেয়ালে সাঁটানো 'নিরব থাকার ও আস্তে কথা বলার' নোটিস দেখিয়ে আস্তে কথা বলতে বললেও ওরা সমানে উচ্চস্বরে কথা বলেই যেতে লাগলো। অথচ ওদের আশপাশে সব ব্রেইন, হার্ট, কিডনী প্যাশেন্ট! ওদের কথার আওয়াজে রোগী ও তার অ্যাটেন্ডেন্টদের ঘুমানো দায়।’

চেয়ারে থাকা ব্যক্তিও কথা শোনেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি কথা না বাড়িয়ে আবার পাঁচতলা থেকে নিচে গেলাম, ওদের মেডিসিন স্টোরে। গিয়ে প্যাড চাইলে আমাকে বলে কাউন্টার থেকে বিল করে নিয়ে আসেন! আমি বললাম, কাউন্টার তো সব বন্ধ, কোথায় বিল করবো? ও আমাকে জানালো ইমার্জেন্সির গেটে একটা কাউন্টার আছে, ওখানে যেনো যাই। গেলাম ওখানে। এবার দেখি একটামাত্র কাউন্টার, সেখানে একজন শশ্রুমণ্ডিত পরিপাটি পোষাক পরা লোক বসে কম্পিউটারে কি যেনো দেখে! বললাম, ভাই একটা বিল করবো। উনি জাস্ট আমার দিকে তাকালেন, কিন্তু আওয়াজ বা ইশারা কিছুই দিলেন না। ভদ্রতাবশতঃ মিনিটখানেক অপেক্ষা করে, আবার বললাম। এবারও তাকালেন, কিন্তু কিছুই বললেন না! মাথা গরম হলেও চুপ করে সরে আসলাম। ওদিকে ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা!’

একটি ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতার বিষয়ে জাফর সাদিক লেখেন, ‘আমি কিছু না বলে সোজা হেঁটে বসুন্ধরার গেট দিয়ে বের হয়ে সোলমাইদ থেকে প্যাড কিনে আবার ফিরে এলাম। এবার যথারীতি লিফটের সামনে যাওয়ার আগে গার্ড আটকাল। উঠতে দিবে না। সব জানিয়ে রাজি করার পর হাতে প্যাডের ব্যাগ দেখে বলল, খাবার নিয়ে যাওয়া যাবে না। এটা কি? আমি বললাম, প্যাড। সে বলে, কী? আমি বললাম মাসিকের রক্ত আটকানোর প্যাড, খেয়ে দেখবেন? এটা বলে তার মুখের উপর দিয়ে লিফটে উঠে গেলাম।’

‘এত আলাপ পারার কারণ হলো, একটা ফাইভ স্টার মানের হাসপাতাল, কতটা অ-নারীবান্ধব হলে এমন করতে পারে? নারী অ্যাটেনডেন্টদের পিরিয়ড হলে গভীর রাতে সব বন্ধ হয়ে গেলেও তার জন্য সামান্য একটা প্যাড আনিয়ে দেওয়ার কোনো দায়ভার নাকি ওদের না! একজন নারী নার্স হয়েও নারীর এই জরুরি অবস্থা তো তারা বুঝেই না, উল্টো সেটি আনতে গেলে এত রাতে যে হ্যাপা বা বাধা সেটিও বুঝিয়ে বলার পরও তাদের উত্তর, এটা নাকি ওদের ইস্যু না! গার্ড আসতে দিবে কিনা, প্যাড নিচ থেকে কেনা যাবে কিনা, এগুলার কোনো তথ্য বা মেকানিজমও ওদের নাই!’

‘অথচ এই মানের একটা হাসপাতালে স্যানিটারি ন্যাপকিন কমপ্লিমেন্টারি রিজার্ভ থাকা উচিত! না হলে ফ্লোরে ফ্লোরে ভেন্ডিং মেশিন থাকা উচিত! তাদের এগুলো তো নাই-ই উল্টো এর দায়িত্বটুকুও তারা নিবে না! বরং ওয়ার্ড-কেবিনের সামনে রাতদিন হাউকাউ করে কথা বলে রোগীর কষ্ট বাড়ানোটাই ওদের স্টার মানের সেবা!’

‘রিসিপশনে নর্থ এন্ড আর রেস্টুরেন্টে বাফেট খাবার রেখেই কি হাসপতাল ফাইভ স্টার হয়? সেবার মান ও স্টাফদের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে সেটা তো সেবার দিক থেকে মিটফোর্ড মানেরও না!’

স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই হলো আমাদের দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কর্মী ও ম্যানেজমেন্টের বোধ, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্ঠা! নার্সদের ডাকতে ডাকতে রোগী অসুস্থ্য হয়ে গেলেও তাদের ভ্রুক্ষেপ হয় না। আমার সামনেই ক্যানোলা, নেবুলাইজার জরার জন্য নার্সদের বারবার ডেকেও না পাওয়ায় অন্তত দুইজন মাকে দিশেহারা ও অসহায় হতে দেখলাম। আচ্ছা, রোগীর সেবার বিষয় না হয় বাদই দিলাম! পিরিয়ডের জন্য জরুরি প্যাড ম্যানেজ করে না দেওয়ার মতো এমন জেন্ডার ইনসেনসেটিভ আচরণ করতেও ওদের দ্বিধা হয় না। আর ওদের কাস্টমার কেয়ারের তো খবরই নেই! কোথায় গেলে কাকে পাওয়া যায়, কাকে অভিযোগ করা যায়, সেটা খুঁজতে খুঁজতেও জান হয়রান। কাউকে অভিযোগটুকু দেওয়ার জন্যও পাওয়া যায় না।’

‘শুধু এটা না, আরো এমন কতগুলো ঘটনার স্বাক্ষী গত তিন দিনে হলাম, তা দেখে মনে হলো, এই দেশে আসলে জটিল রোগের চিকিৎসা করাই উচিত না! কিন্তু সময় স্বল্পতা আর নানা জটিলতায় সর্বোচ্চটুকু পাওয়ার জন্য ওখানে যাওয়া। তাই বলি কি, এভারকেয়ারে সিরিয়াস রোগ নিয়ে আসার আগে টাকা দিয়েও পূর্ণ সেবার বিষয়ে ঘাটতি মেনে নেওয়ার প্রস্ততি মাথায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। না হলে এমন মেজাজ খারাপমার্কা শকড হবেন।’

শেষে জাফর সাদিক বলেন, ‘আসলে এই দেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে আরো কয় দশক লাগবে, সেটা একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন।’

কর্মচারীদের এমন অসহযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে এভারকেয়ার হাসপাতালের ডিউটি ম্যানেজার মো. মাসুম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘কী ঘটেছে, আমার জানা নেই। বিস্তারিত জানতে পারলে খতিয়ে দেখা হবে। নার্সদের কোনো অসহযোগিতা থেকে থাকলে আমাদের জানাতে হবে।’