ডিএসসিসির এডিস লার্ভা জরিপ/ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে ২৯টি ওয়ার্ড, প্রধান প্রজননক্ষেত্র প্লাস্টিক বালতি ও ড্রাম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে পরিচালিত বর্ষাকালীন জরিপে ২৯টি ওয়ার্ডকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার যৌথ বৈজ্ঞানিক জরিপে দেখা গেছে, পরিদর্শিত বাসাবাড়িতে এডিসের লার্ভার প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে শীর্ষে রয়েছে প্লাস্টিক বালতি ও ড্রাম।
চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১২ দিনব্যাপী এই জরিপ চালানো হয়। ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও এর বিস্তার রোধে ডিএসসিসি এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার যৌথ উদ্যোগে এই বৈজ্ঞানিক জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপের এই তথ্য ও পরিসংখ্যান নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি জরিপের আওতায় নেওয়া হয়। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘কুবো টুলবক্স’ ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এই জরিপ কার্যক্রমে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মোট ৩৬ জন মাঠকর্মী সরাসরি অংশ নেন। পরিদর্শিত ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে মোট ৩ হাজার ২২৫টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে।
বাড়ির ধরন অনুযায়ী লার্ভার উপস্থিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বতন্ত্র বাড়িতে ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, বহুতল ভবনে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশ, সেমি পাকা বাড়িতে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ, নির্মাণাধীন বাড়িতে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং খালি প্লটে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে। মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্র হিসেবে প্লাস্টিক বালতিতে ১৮ দশমিক ২১ শতাংশ, প্লাস্টিক ড্রামে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, বেজমেন্টের জমানো পানিতে ৯ দশমিক ১৮শতাংশ, প্লাস্টিক মগে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ফুলের টবে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।
জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে সমগ্র ডিএসসিসি এলাকায় ওয়ার্ডগুলোকে তিনটি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৯টি ওয়ার্ড, মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ২৮টি ওয়ার্ড এবং সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি ওয়ার্ড। অঞ্চলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিএসসিসির বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে এডিসের ঘনত্ব নির্দিষ্ট সূচকের চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে, যা ভবিষ্যতে ডেঙ্গুর বড় ‘হটস্পট’ হয়ে উঠতে পারে।
অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড
ডিএসসিসি এলাকার ১০টি অঞ্চলে সর্বমোট ২৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করা হয়েছে। অঞ্চল-১-এর অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো- ১৫, ১৬, ১৯, ২০ ও ২১। অঞ্চল-২-এ রয়েছে ১, ২, ৯, ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-৩-এর মধ্যে রয়েছে ১৪, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৫৫ ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-৪-এ রয়েছে ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৯, ৪৩ ও ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-৫-এ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড হলো ৫৩ ও ৫৪। এ ছাড়া অঞ্চল-৬-এর ৭৫, অঞ্চল-৭-এর ৭১, অঞ্চল-৮-এর ৫৭, ৬৮ ও ৬৯, অঞ্চল-৯-এর ৬২ ও ৬৩ এবং অঞ্চল-১০-এর ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত।
মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড
সমগ্র এলাকায় মোট ২৮টি ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে অঞ্চল-১-এর মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড হলো ১৮ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-২-এর আওতায় রয়েছে ৪, ৫, ৬, ৮ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-৩-এ ২৩, ২৯ ও ৫৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং অঞ্চল-৪-এ ৩৮ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ। অঞ্চল-৫-এর মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলো হলো ৩৯, ৪০, ৪১ ও ৫২। এর বাইরে অঞ্চল-৬-এর ৭০ ও ৭৪, অঞ্চল-৭-এর ৭৩, অঞ্চল-৮-এর ৬৬ এবং অঞ্চল-৯-এর ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। অঞ্চল-১০-এ কোনো মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড নেই।
সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড
সার্বিকভাবে মোট ১৮টি ওয়ার্ডকে সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। অঞ্চল-১-এর ১৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং অঞ্চল-২-এর ৩ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় রয়েছে। অঞ্চল-৩-এর সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড ২৮ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-৫-এ রয়েছে সবচেয়ে বেশি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড। এগুলো হলো- ৭, ৪১, ৪৪, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫১ ও ৬০ নম্বর ওয়ার্ড। এ ছাড়া অঞ্চল-৭-এর ৭২ নম্বর ওয়ার্ড এবং অঞ্চল-৯-এর ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড এই সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। (অঞ্চল-৪, ৬, ৮ ও ১০-এ কোনো সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড উল্লেখ নেই)।
ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ বা সিটি করপোরেশনের মশা নিধন কার্যক্রম ডেঙ্গু প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। এর জন্য নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত একদিন জমে থাকা পরিষ্কার পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। জনগণ যদি নিজ দায়িত্বে নিজেদের আঙিনা পরিষ্কার না রাখে, তবে এককভাবে প্রশাসনের পক্ষে মশার বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিশুদের সুরক্ষায় ডিএসসিসি এলাকার সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনা ও টয়লেট করপোরেশনের উদ্যোগে প্রতি সপ্তাহের শনিবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হবে বলে জানান আবদুস সালাম।

