logo
Advertisement

চাঁদা দাবিতে দুই চিকিৎসকের ওপর হামলা, মূল পরিকল্পনাকারীসহ গ্রেপ্তার ২

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
চাঁদা দাবিতে দুই চিকিৎসকের ওপর হামলা, মূল পরিকল্পনাকারীসহ গ্রেপ্তার ২
চাঁদা দাবিতে দুই চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের ওপর পরিকল্পিত হামলা এবং ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবির ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হামলার পরিকল্পনা, চাঁদাবাজির উদ্দেশ্য এবং হামলায় জড়িত অন্যান্য সদস্যদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

Advertisement

রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।

গ্রেপ্তার দুজন হলেন সানি সাহা (৩৮) ও ফাতিন ইসরাক লাবিব (২০)।

ডিবি জানায়, ডিবির ওয়ারী বিভাগের সদস্যরা শনিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাতে পৃথক অভিযানে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া গোয়ালপাড়া কদমতলী এলাকা থেকে সানি সাহাকে এবং খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ-২ এলাকা থেকে ফাতিন ইসরাক লাবিবকে গ্রেপ্তার করেন।

যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটে

ডিবি জানায়, গত ২৭ জুলাই ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়কে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল হকের গাড়ির গতিরোধ করে পাঁচ দুর্বৃত্ত। তারা চিকিৎসককে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। ওই ঘটনার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে গোয়েন্দা পুলিশ।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ আগস্ট রাত আনুমানিক ১০টা ৩০ মিনিটে শান্তিনগরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখা শেষে বাসার উদ্দেশে বের হন ঢামেক হাসপাতালের নাক, কান, গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমান। রাত প্রায় ১০টা ৪৫ মিনিটে তিনি পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার সময় জীবন ওরফে আদিলসহ কয়েকজন তার পথরোধ করে।

চিকিৎসক তাদের পথরোধের কারণ জানতে চাইলে হামলাকারীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে সিএনজি থেকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে জীবন ওরফে আদিল চিকিৎসকের ডান চোখে গুরুতর আঘাত করে। অন্য হামলাকারীরাও তার মাথা, চোখ এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। হামলার সময় তাকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়।

এ সময় স্থানীয়রা দ্রুত পল্টন মডেল থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে জীবন ওরফে আদিলকে আটক করে। তবে তার সহযোগীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আহত অবস্থায় ডা. আসাদুর রহমানকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ডা. মো. আসাদুর রহমান বাদী হয়ে পল্টন মডেল থানায় জীবন ওরফে আদিলসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, হামলার কয়েকদিন আগে একটি অচেনা মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে তার কাছে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। দাবিকৃত অর্থ না দিলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

পরিকল্পনার নেপথ্য কাহিনি

ডিবি জানায়, ঘটনার পর হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সানি সাহার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে সানি সাহা জানান, তিনি ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় জেএনএস ইনটেরিয়র ডিজাইনার প্রজেক্ট কোম্পানিতে প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সেখানে ২০২৩ সালে জান্নাত আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ওই ব্যক্তি তাকে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন সানি। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

দেশে ফেরার পর ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জান্নাত আলমগীর হোসেনের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ হয়। তখন সমাজের উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের বাসার ঠিকানা, গাড়ির নম্বর, পেশা, চলাফেরা ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। একই সঙ্গে অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিনুল হক ও অধ্যাপক ডা. মো. আসাদুর রহমানকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায়ের পরিকল্পনার দায়িত্বও দেওয়া হয়।

হামলাকারী সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন লাবিব

গ্রেপ্তার ফাতিন ইসরাক লাবিব জিজ্ঞাসাবাদে জানান, প্রায় আড়াই মাস আগে ফুড ডেলিভারির কাজ করতে গিয়ে সানি সাহার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়। সানি সাহার নির্দেশে তিনি হামলা চালানোর জন্য আবু বকর (১৮), রাতুল (১৯), ইবান (২২), জীবন (২১) ও সাব্বিরকে (১৮) ১ লাখ টাকার বিনিময়ে কাজে নিয়োগ করেন। পরে তারা সংঘবদ্ধভাবে চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালায়।

ডিবি জানিয়েছে, এই মামলায় ইবান ও জীবন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্য জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ডিবি আরও জানায়, গ্রেপ্তার সানি সাহা ও ফাতিন ইসরাক লাবিবের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা করা হয়েছে। হামলার পেছনে থাকা পুরো চক্র, তাদের অর্থের উৎস এবং সম্ভাব্য অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়।