তেল সংকটে নতুন পরীক্ষা, কতটা কার্যকর ফুয়েল পাস?

রাজধানীর পাম্পগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। দিন-রাত দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন যানবাহনের চালকেরা। এই সংকট মোকাবিলায় ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট পাম্প ও আসাদ গেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে এরই মধ্যে মোটরসাইকেলের জন্য চালু হয়েছে পাইলটিং কর্মসূচি। এই দুটি স্টেশনে ভালো ফল পেলে ঢাকা শহরের সব পাম্পকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে জ্বালানি বিভাগের।
নতুন এই পদ্ধতি চালুর মূল উদ্দেশ্য অবৈধ তেল মজুত থামানো এবং ন্যায্য বিতরণ নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে পাম্পে যানবাহনের ভিড় কমবে, চালকদেরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হবে না।
ফুয়েল পাস মূলত একটি কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থা। প্রতিটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও মালিকের তথ্য এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। পাম্পে তেল নেওয়ার সময় এই কোড স্ক্যান করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তেল বরাদ্দ হয়। ফলে কে কোথা থেকে কতটা তেল নিচ্ছেন তার রেকর্ড থেকে যায়। এই স্বচ্ছতার ফলে বারবার তেল নিয়ে মজুত করার পথ বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পদ্ধতি সফল হলে সব ধরনের যানবাহন ও পাম্পকে এর আওতায় আনা হবে।
যা বলছেন ব্যবহারকারীরা
পাইলটিং কর্মসূচির অংশ হিসেবে মাত্র দুটি পাম্প ও স্টেশনে সম্প্রতি এ পদ্ধতি চালু করেছে সরকার। তবে নতুন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগছে অনেক চালকের।
ট্রাস্ট পাম্পে মোটরসাইকেলচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কার্ডের মাধ্যমে তেল পাওয়া গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হবে না। এটা ভেবে ভালো লাগছে। তবে কার্ড সংগ্রহে অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে।’
প্রাইভেটকারচালক মনির হোসেন বলেন, ‘আমরা এখনও পাসের আওতায় আসিনি। তবে আমরা চাই তেলের ন্যায্য বণ্টন। পাসের মাধ্যমে তেল দিলে অন্তত পাম্প মালিকরা তেল নেই বলে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। যদিও একটি গাড়ির জন্য বরাদ্দ কতটুকু হবে, তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে।’
ট্রাস্ট পাম্পে তেল নিতে আসা বাইকচালক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি স্বাভাবিক সিরিয়ালে ১২ নম্বরে ছিলাম। কিন্তু আমাদের বলা হলো ফুয়েল পাস যাদের আছে তারা আলাদা লাইনে দাঁড়ান। আমরা দাঁড়ালাম, কিন্তু এখন দেখি যাদের পাস নেই তাদের তেল দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমাদের খবর নেই। সেই দুপুর থেকে বসে আছি, এখন বিকেল সাড়ে ৫টা বাজে কিন্তু আমাদের লাইন এগোচ্ছে না।’
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন পদ্ধতিতে প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা হলেও ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে এগুলো দূর হয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের প্রতিক্রিয়া
সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে ইতোমধ্যেই এটি চালু হয়েছে। ওরা সফলতাও পেয়েছে। আমাদের এখানেও সফলতা না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি এই পদ্ধতিকে অবশ্যই খুব ভালোভাবে সমর্থন করি। সরকার চাইলে আরও কিছু জিনিস এখানে যোগ করতে পারে। সেটা হচ্ছে ইন্টারনেট অব থিংস ব্যবহার করে তেল একদম ডিপো থেকে সরাসরি কোথায় কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে ও কিউআর কোডের সঙ্গে যদি এটা সংযোজন করে দেওয়া হয় তাহলে কিন্তু তার একটা হিসাবের স্বচ্ছতা থাকবে। তখন ডিপোগুলোও নজরদারির আওতায় চলে আসবে।’
নতুন পদ্ধতির অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন কিছু চালক। তবে ড. ইজাজ মনে করেন এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রমযোগ্য। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে গোলমাল থাকবে। কোভিডের সময় টিকার রেজিস্ট্রেশন, বুকিং করার সময় অর্থাৎ প্রথম দিকে কিন্তু গোলমাল ছিল। এখানেও শুরুর দিকে একটু গোলমাল থাকবে। ইন্টারনেটের কারণে এগুলো আজকাল একেবারে সহজ হয়ে গেছে। শুধু ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে করতে হবে।’