logo

‘বড় ডাক্তারে’র খপ্পরে পড়ে প্রাণ গেল রোগীর

‘বড় ডাক্তারে’র খপ্পরে পড়ে প্রাণ গেল রোগীর

আবু হুরায়রার বাবা জিন্নাত আলী আর বেঁচে নেই। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু বাবার বিদায়ে শোকের পাশাপাশি বিচার চেয়ে এখন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছেন আবু হুরায়রা। কিন্তু কেন? কারণ তার বাবার মৃত্যু ঘিরে ছিল প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রাণ নিয়ে অর্থ উপার্জনের এক নগ্ন খেলা।

অকুস্থল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। আবু হুরায়রা তার বাবার হার্টের সমস্যা নিয়ে সেখানে আসেন। এ সময় হাসপাতালে থাকা এক প্রতারক এগিয়ে এসে জানান, তার বাবার হার্টে নয়, মাথায় সমস্যা। জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নিতে হবে। ফলে গুনতে হবে টাকা। একসময় টাকাও পরিশোধ করেন আবু হুরায়রা। শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তিনি আটকা পড়েন প্রতারণার জালে। আর এর শেষ পরিণতি হয় তার বাবার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে আবু হুরায়রা এশিয়া পোস্টকে জানান, ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার। সকাল ৭টার দিকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকার হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসেন তিনি। জরুরি বিভাগে সামনে যেতেই দেখা হয় এক ‘বড় ডাক্তার’-এর সঙ্গে। তার নাম শাহেদ। তিনি তার পরামর্শ নেন। অনেকগুলো ওষুধও লিখে দেন। আবু হুরায়রার বাবার হার্টের সমস্যা হলেও শাহেদ তাদের জানান, তার হার্টে নয়, মাথায় সমস্যা। তাকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নিতে হবে। আইসিইউ ঢাকার আর কোথাও নেই, তাই তাকে হৃদয় জেনারেল হাসপাতালে নিতে হবে। দিনে খরচ পড়বে ১৫ হাজার টাকা করে।

বাবার সুস্থতার জন্য সরল বিশ্বাসে কোনো কিছু না ভেবেই শর্তে রাজি হন আবু হুরায়রা। পরে সেখান থেকে তাকে ওই ক্লিনিকে নেওয়া হয়। ক্লিনিকে ভর্তি করেই শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ১০ মিনিট পরপর তার কাছে ৫ থেকে ৬ হাজার করে টাকা চায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এবং তাদের নিজস্ব ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিতে বাধ্য করা হয়। এবার আবু হুরায়রার সন্দেহ হয়। তার মতো আরও রোগীর সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছে দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সেখান থেকে তার বাবাকে নিয়ে যাবেন। কিন্তু মাত্র আড়াই ঘণ্টায় তার বাবার চিকিৎসা বাবদ বিল দেখানো হয় ২৭ হাজার টাকা। এই টাকা না দিলে সেখান থেকে বের হওয়া যাবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। শেষে টাকা দিতে না পারায় প্রায় ৩ ঘণ্টা তাদের আটকে রাখা হয়।

আবু হুরায়রা বলেন, ‘আমি অনেকবার তাদের হাতেপায়ে ধরে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তারা আমাকে ছেড়ে দেয়নি। আমি তাদের বারবার বলেছি, ভাই আমার আব্বা মারা যাচ্ছে, আমাকে যেতে দেন। কিন্তু তারা আমাকে ছাড়েনি। তিন ঘণ্টা পর আমি গ্রামের বাড়ি থেকে ধার করে তাদের ১৫ হাজার টাকা দিলে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। পরে বাবাকে আবার হৃদরোগ হাসপাতালে নিয়ে গেলে ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে তিনি মারা যান। তারা আমার সঙ্গে প্রতারণা করেই আমার বাবাকে হত্যা করেছে।’

আবু হুরায়রা জানান, প্রতারক শাহেদকে খুঁজতে দুদিন পর আবারও হাসপাতালে যান আবু হুরায়রা। সেখানে তাকে দেখতে পেয়ে জানতে চাইলে শাহেদের নির্দেশে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে মারধর করে। কিন্তু নাছোড়বান্দা আবু হুরায়রা বাবার হত্যার বিচারের দাবিতে অনড় থাকেন। তিনি তার সঙ্গে করা প্রতারণার বিচার চেয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পাশাপাশি শেরে বাংলা থানা ও মোহাম্মদপুর থানায়ও অভিযোগ করেন।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে হৃদয় জেনারেল হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট মো. জুনায়েদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘একটা পেশেন্টকে তো আমরা মার্কেট থেকে জোর করে আনি না। একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের মাধ্যমে আপনি এখানে আসলেন আবার ভর্তি হয়ে কিছুক্ষণ সেবা নিয়েই চলে গেলেন। এটার ভিত্তিতে আবার অভিযোগও দিলেন, সেটা তো হয় না। আমরা ওই দিনের সিসিটিভি ফুটেজ, অডিও-ভিডিও সব দেখাতে পারব। বিল যা হয়েছে আমরা তা-ই করেছি। উল্টো তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে ডিসকাউন্ট করে বিলের থেকে ১০ হাজার টাকা কম নিয়েছি।’

তিন ঘণ্টা আটকে রাখার কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. জুনায়েদ বলেন, ‘আসলে হায়াত-মউত তো আমাদের হাতে নেই। উপরওয়ালা যাকেই খুশি তাকেই নিয়ে যান। এমন না যে আমরা তাকে মেরে ফেলেছি। আমরা কি তার কোনো ট্রিটমেন্ট করিনি? এমন তো না যে উনিই প্রথম মারা গেলেন। আইসিইউর পেশেন্ট মানে মারা যাবেই। তাহলে তো সবাই অভিযোগ করা শুরু করবে। আপনি যদি বাংলাদেশের জরিপ দেখেন, আইসিইউর ১০টা রোগীর মধ্যে ৯টা রোগীই মারা যায়। লাইফ সাপোর্টের রোগী মারা যাওয়া একটা নরমাল বিষয়।’

জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) যোবায়ের এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যিনি অভিযোগ করেছেন, উনি সেই দালালের বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তাকে চেনেনও না। তাই এখনো কিছু করা যায়নি। আমি আগামীকাল ওনাকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাব। তারপর আরও বিস্তারিত জানাতে পারব।’

অভিযোগের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এটা নিয়ে একটি তদন্ত করছি। চিঠিটা আমরা গতকাল বিকেলে পেয়েছি। ওই কালপ্রিটের ছবিও পেয়েছি কালকে। কিন্তু ছবি পেলেও ওই কালপ্রিটকে না ধরতে পারা পর্যন্ত তো কোনো উপায় নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাইরের একটা লোক এসে এখানকার স্টাফ পরিচয় দিয়ে এ ধরনের কাজ করবে, এটা চিন্তা করা যায়? আমরা এটা বের করার চেষ্টা করছি। এটা বের হলে আমি আপডেট জানাতে পারব।’