রাজধানীতে হঠাৎ কেন যানজট বেড়েছে

রাজধানী ঢাকায় যানজট নতুন কোনো সমস্যা নয়। অনেক বছর ধরেই নগরবাসীর ভোগান্তির অন্যতম কারণ এটি। তবে দীর্ঘদিন সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও হঠাৎ করেই কিছু দিন ধরে এটি যেন কয়েক গুণ বেড়েছে। মাসখানেক ধরে এই যানজট যেন চিরচেনা রূপ ধারণ করেছে।
শুধু দিনেই নয়, এখন রাতের বেলায়ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকছে যানবাহন। একদিকে প্রধান সড়কগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্পের খোঁড়াখুঁড়ি, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, অতিরিক্ত হিসেবে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল—সব মিলিয়ে যেন ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে তিলোত্তমা নগরী।
সকালে বনানী থেকে কারওয়ান বাজার যাওয়ার পথে বিজয় সরণি মোড়ে বাসে আটকে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী শরিফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আগে এই পথটুকু যেতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট লাগত, এখন লাগছে দেড় ঘণ্টার বেশি। গরমে বাসের ভেতরে থাকা এখন নরক যন্ত্রণার মতো। গত কিছু দিন ধরে এই জ্যাম অনেক বেড়ে গেছে। যা দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।
চালকদের ক্ষোভ প্রকাশ
ক্ষোভ প্রকাশ করে গতকাল রাতে মাহাবুর আলম সোহাগ নামের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন, প্রতিদিন রাতে বনানী থেকে বিজয় সরণি বেশ ভোগান্তি হচ্ছে। আজ দেখলাম তিনটি লাইন করা হয়েছে। প্রথমটা প্রাইভেট কার, দ্বিতীয়টা মোটরসাইকেল ও তৃতীয়টা কাভার্ড ভ্যান। এতে মূল রাস্তাটা চিকন হয়ে গেছে। তারা তেল নিতে ভুগছে। আর আমরা ভুগছি চলাচল করতে। অথচ ওই রাস্তায় শৃঙ্খলা তৈরি করতে রাষ্ট্রের কোনো উদ্যোগ নেই।
তেল নিতে শাহবাগের পরীবাগ এলাকার একটি পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকচালক আব্দুর রহিম মিয়া বলেন, চার ঘণ্টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি তেলের জন্য। পাম্পের গাড়ি রাস্তায় থাকায় অন্য গাড়িগুলা যেতে সমস্যা হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ এসে আমাদের গালি দেয়, কিন্তু আমরা কই যাব? তেল না নিয়ে তো গাড়ি চালাতে পারব না।
সিএনজি অটোচালক কলিমউল্লাহ বলেন, সারা ঢাকা শহরের রাস্তায় খানাখন্দ, তার ওপর একপাশে তেলের লাইন। রাত হলেই এই লাইন রাস্তায় ডাবল হয়ে যায়। গাড়ি চালানোর জায়গা কোথায়? সারা দিন জ্যামে বসে থাকলে জমার টাকাই ওঠে না। বউ-বাচ্চা ও সংসারের খরচ চালানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
চলমান এই মানবিক সংকটে আরও যোগ হয়েছে প্রধান সড়কগুলোতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাওয়া ব্যাটারিচালিত রিকশা। গলিপথ ছেড়ে এগুলো এখন রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতেও রাজত্ব করছে। কোনো সিগন্যাল বা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করে হুটহাট মোড় বদলানো আর মাঝরাস্তায় যাত্রী নামানোর ফলে যানজট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
বাইক রাইডার আসলাম হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, এমনিতেই তেলের লাইনের জন্য রাস্তা ছোট হয়ে গেছে, তার ওপর ব্যাটারি রিকশার জ্বালায় গাড়ি চালানো দায়। এরা হুটহাট বাইকের সামনে চলে আসে। এদের কারণেই মোড়ে মোড়ে জটটা বেশি পাকায়। মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে এরা ইচ্ছে করেই পুরো রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহাসড়কে এই ধীরগতির ও ঝুঁকিপূর্ণ বাহনগুলো চলাচল করায় যান্ত্রিক যানবাহনের গতিবেগ কমেছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই অব্যবস্থাপনা ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
যানজট বেড়ে যাওয়া হতাশাজনক মন্তব্য করে ব্যক্তিগত গাড়ি এড়িয়ে গণপরিবহন নির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, তেলের লাইনে অধিকাংশই তো ব্যক্তিগত গাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর শহর আমরা তৈরি করেছি। বিশ্বের যেকোনো মেগা সিটি গণপরিবহননির্ভর। সেখানেও ব্যক্তিগত গাড়ি থাকে। কিন্তু মূল কাজ থাকে গণপরিবহনের ওপর। ফলে কোনো কারণে যদি সংকট তৈরি হয় শহরটা বেশি ভোগে না। কিন্তু আমরা গণপরিবহনকে প্রাধান্য দিই না।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ আরও বলেন, আমাদের ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা বেশি। এখন মূল সমস্যার সমাধানটা আসলে ঢাকা শহরে মানসম্মত গণপরিবহন লাগবে। সেটা শুধু মেট্রোরেলের একটামাত্র লাইন দিয়ে চলবে না। পাবলিক বাসগুলো ভালো করতে হবে। যেহেতু আমাদের পাবলিক বাসগুলা ভালো না, এ জন্য আমাদের বিকল্প নেই। এ জন্য মানুষ আরও ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকছে। ফলে যানজটসহ অন্যান্য সংকট বাড়ছে। আমাদের সরকারের এখন উচিত, গণপরিবহন কীভাবে ঢেলে সাজানো যায় সেটা নিয়ে চিন্তা করা।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ঢাকা শহরের ভিতরের ফিলিং স্টেশনগুলো খুব অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা। গাড়ি যে সারি করে তেল নেবে, সেই জায়গাও অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনের নেই। স্বাভাবিক সময়ে আমরা দেখি অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে তেল নেওয়ার ক্ষেত্রে রাস্তার ওপরে গাড়ি চলে যায়, তখন এক লেন পর্যন্ত ছিল। এখন যেহেতু সংকট, চাপ বেশি, তাই দুই লেন, তিন লেন পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। সড়কের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই তেলের জন্য দখল হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তেলের কারণে যারা লাইনে দাঁড়াচ্ছে, তাদের মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা কাজ করছে। সে কখন তেল পাবে, সে জানে না। এই জায়গাগুলোতে আমি বলব, আমাদের সামনে খুব বেশি অপশন নাই। সরকারকে সুস্পষ্ট করে এটা বলতে হবে যে সংকটটা আসলে কোন জায়গায়? যেহেতু আমাদের ডিপোতে সংকট নেই, পরিবহনের সংকট নেই। বলা হচ্ছে, ফিলিং স্টেশনেও পর্যাপ্ত তেল আছে, তাহলে সংকটটা আসলে কোন জায়গায় এটা সরকারকে সুস্পষ্ট করা উচিত। একই সঙ্গে ফিলিংস্টেশনে তেল নেওয়ার ক্ষেত্রে যারা ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আছে, তাদের একটু ভালো ম্যানেজমেন্টের আওতায় আনা ছাড়া হাতে আর অপশন নেই। তাদের জানাতে হবে, আসলে কী পরিমাণ তেল আছে, সেটা কতক্ষণ তারা সরবরাহ করতে পারবে।
বুয়েটের এই অধ্যাপক আরও বলেন, তেল দেওয়ার সময় পেমেন্ট সিস্টেম থেকে শুরু করে সব কাজ যেন সঠিক ব্যবস্থাপনায় করা যায়, সেটা নিশ্চিত করা। এখন এই ব্যবস্থাপনা দুই সাইড থেকেই হতে হবে। সরকার থেকেও এবং ফিলিং স্টেশন থেকেও। যারা বারবার তেল নেওয়ার সুযোগ খুঁজছে, আমি মনে করি তাদের কঠিন পেনাল্টি করা উচিত। শুধু অর্থদণ্ড না, কারাদণ্ডও দিতে হবে। যাতে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি এটা করার সাহস না করে।