
রাজধানীর পল্টন থেকে নর্থ সাউথ রোড এলাকার ফুটপাতে আবারও বসতে শুরু করেছেন হকাররা। উচ্ছেদ অভিযান ও হকারমুক্ত ঘোষণার এক সপ্তাহ পেরোতেই সড়কের পাশে নানা জায়গায় ফিরেছে আগের চিত্র। কোথাও আবার ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়কেও উঠে এসেছেন হকাররা।
রাজধানীর পল্টন মোড় থেকে জিরো পয়েন্ট (জিপিও) হয়ে নর্থ সাউথ রোড এলাকা পর্যন্ত সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযান চালায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম নিজে উপস্থিত থেকে এই অভিযান পরিচালনা করেন। পরে এলাকাটি হকারমুক্ত ঘোষণা করা হয়।
ঘোষণার পর প্রশাসক বলেন, মূল সড়কে কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় নগরবাসী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উচ্ছেদের পর প্রথম এক-দুই দিন প্রশাসনের কড়া নজরদারি ছিল। ফলে তখন ফুটপাত ফাঁকা ছিল। পরে নজরদারি কমে যাওয়ায় আগের চিত্র ফিরতে শুরু করে।
সরেজমিনে শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে পুরো এলাকা ঘুরে দেখে এশিয়া পোস্ট। এতে দেখা যায়, পল্টন মোড় থেকে জিপিও পর্যন্ত রাস্তার পূর্ব পাশের ফুটপাতে হকাররা পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়কে বসেছেন অনেকে। ছোটবড় সবার জামা-কাপড় পাওয়া যাচ্ছে মূল সড়কে।
মুক্তমঞ্চের সামনে থেকে জিপিও মোড় পর্যন্ত পুরো ফুটপাত স্যুট-টাইয়ের দোকানে ঘেরা। সড়কের পশ্চিম পাশে সচিবালয়সংলগ্ন ফুটপাতে দোকান কম। তবে সেটিও একেবারে খালি নয়।
ডিএসসিসির প্রশাসক জানিয়েছিলেন, রমনা ভবনসংলগ্ন পূর্ব পাশের ফুটপাতে সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা রেখে নির্ধারিত স্থানে নিবন্ধিত নির্দিষ্টসংখ্যক হকার বসতে পারবেন। নির্ধারিত স্থান, সময়, সংখ্যা ও নিবন্ধনের বাইরে যত্রতত্র হকার বসে জনভোগান্তি তৈরির সুযোগ নেই। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, জিপিও থেকে গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত পূর্ব পাশের ফুটপাতে ফলমূল, কাপড়চোপড়, জুতাসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান বসেছে। এসব দোকান ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিম পাশের ফুটপাতে মূল সড়কে দোকান তুলনামূলক কম।
মাজার থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার (উত্তর) মার্কেটের মোড় (ফুলবাড়িয়া) পর্যন্ত পূর্ব পাশের চিত্র ভিন্ন। এই অংশে পুরো ফুটপাতজুড়ে সারি সারি দোকান বসেছে। দোকানের সারি ও আলোকসজ্জার কারণে অংশটি দেখতে বড় কোনো মার্কেটের ভেতরের গলির মতো। এই অংশেও পশ্চিম পাশের ফুটপাতে দোকান অপেক্ষাকৃত কম।
পুনরায় হকার বসার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আমাদের বেশকিছু প্ল্যান আছে। নিয়মিত অভিযানে যদি তারা উঠে না যায়, এরপর সরাসরি মামলা করব। উচ্ছেদের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কঠোর।’
ফুলবাড়িয়া এলাকায় কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘টিভিতে কয়েক দিন আগে দেখলাম এই এলাকা হকারমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসে দেখছি উল্টো চিত্র। হকারদের কারণে আমাদের মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হচ্ছে।’
ফুলবাড়িয়া মার্কেট মোড় থেকে নর্থ সাউথ রোডের শেষ পর্যন্ত ফুটপাতে অভিযানের আগেও খুব বেশি দোকানপাট ছিল না। তবে এই এলাকায় বড় বড় দোকানের মালামাল ফুটপাতে রাখায় পথচারীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাদের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়।

হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত একটি সিন্ডিকেটের হাত ধরে উচ্ছেদের এক সপ্তাহ পার হতেই ফুটপাত বেদখল হয়ে গেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও লাইনম্যানদের নিয়ে গঠিত এই সিন্ডিকেট দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা তোলে।
হকারদের ভাষ্য, উচ্ছেদ অভিযান মূলত লোকদেখানো। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোলাপ শাহ মাজার এলাকার একজন হকার বলেন, ‘উচ্ছেদ করলে আমাদের কয়েক দিন ব্যবসা বন্ধ থাকে, লস হয়। পরে লাইনম্যানদের ম্যানেজ করে আবার বসতে হয়। দিনের চাঁদা দিনে ঠিকমতো দিলেই আবার সব ঠিক।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘হকারমুক্ত ঘোষণা করা হয়, আবার হকাররা চলে আসে। এটা হয় মূলত সক্রিয় সিন্ডিকেটের কারণে। এসব সিন্ডিকেটে সরকারদলীয় লোকজনই থাকে। সরকারের কাছে অবশ্যই তথ্য আছে, কে কোন এলাকা দখলে রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের কাছে এসব তথ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের (সিন্ডিকেটের সদস্য) ধরে না। তারা হকারদের উচ্ছেদ করে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই এসব নির্মূল করা সম্ভব। সেটা করা হয় না বিধায় তারা পুনরায় এগুলো বসায় এবং আগের থেকে আরও বেশি মাসোহারা আদায় করা হয়। সুতরাং ধরতে হবে যারা এসব করায় তাদের, তাহলেই সমাধান হবে।’
