বিজয় রাকিন সিটির প্রশাসকের বিরুদ্ধে অর্থ লোপাটসহ অভিযোগের পাহাড়

রাজধানীর কাফরুলের বিজয় রাকিন সিটির প্রশাসক আবু মো. ইশতিয়াক আজিজের অপসারণে দাবিতে মানবন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন বাসিন্দারা। শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে বিজয় রাকিন সিটির ভেতরে এ মানবন্ধন ও বিক্ষভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় ওই সিটির মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবার কল্যাণ সমিতির সদস্যরা, সাতটি ভবনের পরিচালনা কমিটি এবং সাড়ে তিন শতাধিক বাসিন্দা উপস্থিত ছিলেন।
মানবন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিলে 'দুর্নীতিবাজ প্রশাসকের অপসারণ করতে হবে', 'দুর্নীতিবাজ প্রশাসক ইসতিয়াকের বিচার চাই, বিচার চাই', 'প্রশাসকের দুর্নীতি মানি না, মানবো না', 'ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও, দুর্নীতিবাজ প্রশাসকের কালো হাত'সহ নানা স্লোগান দিয়ে বিজয় রাকিন সিটি প্রদক্ষিণ করেন বিক্ষোভকারীরা।
মানবন্ধনে বিজয় রাকিন সিটির অ্যাপার্টমেন্ট ওনার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সভাপতি ও ফ্ল্যাট মালিক সরদার ইলিয়াস হোসেন বলেন, 'আগস্টে পট পরিবর্তনের পরে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ সমিটিকে ভেঙে দেওয়া হয়। সেখানে অতিরিক্ত সচিব আবু মাসুসকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ওনার দায়িত্ব ছিল ৯০ দিনের মধ্যে সদস্যদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু তিনি তা না করে ফান্ডের ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা লুটপাট করেছেন। আরও ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা লুটপাটের চেষ্টা করেছিলেন। তা আমাদের এবং সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপে সেটি বন্ধ হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'পরে আমাদের আবেদনের ভিত্তিতে সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগের সত্যতা পায় এবং তাকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তা বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর বাদী হয়ে একটি মামলা করে।'
সরদার ইলিয়াস বলেন, 'ওই দুর্নীতিবাজ প্রশাসকের পর নতুন প্রশাসক আবু মো. ইশয়াক আজিজ যোগদান করেন। তিনি ৯০ দিনের মধ্যে ইলেকশন না দিয়ে আগের প্রশাসককে অনুসরণ করে ইতোমধ্যে ৭০ লাখ টাকা উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। আমরা তার বিরুদ্ধেও সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তরে অভিযোগ দিয়েছি। পরে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত কাজ চালাচ্ছে।'
ফ্ল্যাট মালিকদের হুমকির কথা উল্লেখ করে ইলিয়াস বলেন, 'এইভাবে যদি আমাদের কষ্টার্জিত এবং সদস্যদের চাঁদার অর্থ একের পর এক লুটপাট হয়ে যায়, তাও আবার সরকার থেকে নিয়োগ করা লোকেরা, তাহলে তো আমাদের কিছুই থাকবে না।'
ফ্ল্যাটের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম বলেন, '১৯৯৭ সালে আমাদের সমিতির রেজিস্ট্রেশন হয়। ১৯৯৯ সালে আমরা সরকার থেকে বাজার মূল্যে জায়গাটি পাই। পরবর্তীতে ডেভেলপার কোম্পানি রাকিনের সঙ্গে চুক্তিতে আমরা ফ্ল্যাট পেয়ে বসবাস করি।'
তিনি বলেন, 'বর্তমান প্রশাসক কিছু সন্ত্রাসী লোক নিয়ে এসে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা অফিসের তালা ভেঙে অফিস দখল করেন। সেই সঙ্গে যেসব ফ্ল্যাট মালিক দূরে রয়েছে, সেসব ফ্ল্যাট দখল করে ভাড়া দিচ্ছেন। এ ছাড়া প্রতিটি ফ্ল্যাটে চিঠি দিয়ে ওনার অনুমতি ছাড়া কেউ ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন। অথচ গৃহায়ণ থেকে ফ্ল্যাট বিক্রি করার জন্য আমাদের অনুমতি রয়েছে।'
মফিজুল ইসলাম বলেন, 'প্রশাসকের এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমরা শঙ্কিত, হতাশাগ্রস্ত। দুর্নীতির মাধ্যমে প্রশাসক যে টাকা আত্মসাৎ করেছেন, সেটা ফেরত দেওয়ার এবং সরকারের কাছে তার বিচার দাবি করছি।'
প্রকৌশলী এটি এম খালেদুজ্জামান বলেন, 'প্রশাসক মহোদয় বিভিন্ন মিথ্যাচার করে মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় এবং পরিবারের সদস্যদের মানহানি ও হেনস্তা করছেন। সেই সঙ্গে তাদের ফ্ল্যাটগুলো বেদখলের হুমকি দিচ্ছেন। যার কারণে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমারা এটি কোনোভাবেই সাপোর্ট করি না। তার অপসারণ ও আমরা তার বিচার চাই।'
মানবন্ধনে বক্তারা বলেন, 'প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সুষ্ঠ ও সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারা সেটা না করে আমাদের অর্থ লুটপাট করে খাচ্ছে।'
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু মো. ইশতিয়াক আজিজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি কোনো অর্থ আত্মসাৎ করিনি। আমি রাকিন সিটি প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ১১টি মামলা ছয় মাস ধরে পরিচালনা করছি। যার মধ্যে ৯টি মামলার বিবাদী আমি এবং ২টি মামলার বাদী আমি। এ ছাড়া আমার বেতনের টাকা, অফিস মেরামত এবং অন্যান্য খরচ বাবদ প্রায় ৭০ লাখ টাকা খরচ করেছি, যা কমিটিকে জানিয়ে এবং তাদের কাছে বাজেট পেশ করে পাস করার পর করা হয়েছে।'
উল্টো অভিযোগ করে তিনি বলেন, 'একটি বড় মাফিয়া চক্র রাকিন সিটি অবৈধভাবে দখল ও লুটপাট করার পাঁয়তারা করছে। কিন্তু আমি এতে বাধ দিলে তারা না পেরে আজ মানববন্ধন করেছেন।'
গুরুতর অভিযোগ তুলে প্রশাসক ইশতিয়াক বলেন, ‘১৯৯১ সালে ওই সমিতির (মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি) সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদের বয়স ছিল পাঁচ বছর। অথচ সে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে এখানে অ্যাপার্টমেন্ট দখল করেছে। এ ছাড়া পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান হামিদুল হককে সঙ্গে নিয়ে তাকে সভাপতি করে আওয়ামী লীগের শেখ সেলিম, সাবেক আইজিপি বেনজীরসহ বিভিন্ন মানুষের নামে ২৬৯টি অ্যাপার্টমেন্ট দখল করেছে, যার মধ্যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ১০০টি, আওয়ামী লীগ আমলের সবিচ, উপসচিবসহ অনেক আমলারও প্লট রয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ১০ বছরের আগে এসব প্লট হস্তান্তর বা বিক্রি করার বিধান নেই।’