ছোট মেয়েকে হারিয়ে বড় মেয়ের জন্য কাঁদছেন ইমাম সিরাজউদ্দৌলা

ফরিদপুরে একটি মসজিদের ইমামতির কাজ করেন সিরাজউদ্দৌলা। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি সেখানে ইমামতি করতেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি শুধু একজন ইমামই নন, অভিভাবকও হয়ে উঠেছিলেন। সবাই যখন কর্মব্যস্ততা থেকে ছুটি নিয়ে পরিবারের কাছে ছুটে যান, তখন তার কাঁধে থাকে বিশাল দায়িত্ব।
শনিবার (২১ মার্চ) ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়ান সিরাজউদ্দৌলা। পরে সপরিবার মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসে করে লক্ষ্মীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী, দুই কন্যাসন্তান। ভেবেছেন বাড়ি গিয়ে অসুস্থ মায়ের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন আর শ্যালকের বিয়েতে অংশ নেবেন।
কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই তার জীবনে নেমে এল মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। যাত্রাপথে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে চুরমার হয়ে যায় তার সুখের সংসার।
এদিকে শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার জাঙ্গালিয়ার কচুয়ায় পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড রেলক্রসিংয়ে ঘটে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। মামুন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস রেলক্রসিংয়ের ওপরে উঠতেই চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী ‘চট্টগ্রাম মেইল’ ট্রেনের ধাক্কায় বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বাসটিকে ঠেলে আধা কিলোমিটার নিয়ে যায় ট্রেনটি। এতে ১২ জন প্রাণ হারান। মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে চিৎকার, আর্তনাদ আর আতঙ্ক।
সেই বিভীষিকাময় দুর্ঘটনার সাক্ষী হন সিরাজউদ্দৌলা ও তার স্ত্রী-সন্তানরা। তার ১০ বছর বসয়ী ছোট মেয়ে মাহজাবিন মোশাররাদ সাইয়্যেদা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। বড় মেয়ে তাসনিবা তাবাসসুম ধানমন্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছে।
এ ঘটনায় সিরাজউদ্দৌলা ও তার স্ত্রী সামান্য আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর তাদের নিকটাত্মীয়রা খবর পেয়ে তাদের উদ্ধার করে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুর্নবাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নিয়ে আসেন। সেখানে জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
সিরাজউদ্দৌলার জীবনে আগেও এক কঠিন মুহূর্ত এসেছিল। বছর খানেক আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তার বড় ছেলে ফখরুল আজম রুম্মান মারা যায়। মেধাবী সন্তানকে হারিয়ে সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আজ আরেক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি।
রোববার (২২ মার্চ) দুপুর ২টার দিকে পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কথা হয় সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই দুর্ঘটনা আমাকে চিরতরে নিঃস্ব করে দিয়েছে। আমার সহধর্মিণী ও দুই মেয়েসহ বাড়িতে অসুস্থ মায়ের সঙ্গে দেখা করা এবং ছোট শ্যালকের বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার উদ্দেশ্যে আমি লক্ষ্মীপুরে যাচ্ছিলাম। সেখানে যাওয়ার পথেই এই দুর্ঘটনার শিকার হই। আমার ছোট মেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছে। বড় মেয়ে আইসিইউতে আছে। আমি আর আমার সহধর্মিণী সামান্য আহত হয়েছি।’
ছেলের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘মাত্র এক বছর আগেই বড় ছেলেকে হারিয়েছি। আমার তিন সন্তানই অত্যন্ত মেধাবী। ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিল। সে ফিনল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছিল। ভেবেছি জমিজমা বিক্রি করে হলেও তাকে বিদেশে পড়াশোনা করাব। সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। আমার মেজো মেয়ে ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী। এই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে সে আইসিইউতে জীবনমৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ছোট মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। সে আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেল। আমার আর কিছুই রইল না। আমি সব হারায় ফেললাম।’
সিরাজউদ্দৌলা দাবি করে বলেন, তার শ্যালকের কয়েক দিন পরেই বিয়ে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বিয়েতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। রওনা দেওয়ার সময় শ্যালকের জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকার গয়না ও নগদ দুই লাখ টাকা সঙ্গে নেন। দুর্ঘটনার পর হতবিহ্বল পরিস্থিতিতে এসব গয়না ও টাকার ব্যাগ তার গলা থেকে কে বা কারা জোর করে নিয়ে গেছে, তিনি তা খেয়াল করতে পারেননি। এ ছাড়া তাদের চারটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনও খোয়া গেছে।
তিনি ও তার স্ত্রী যখন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, অন্যদিকে বড় মেয়ে তাসনিবা তাবাসসুমকে প্রথমে ধানমন্ডিতে অবস্থিত ইবনে সিনা হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। পরে পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
তার বড় মেয়ে তাসনিবা তাবাসসুমের সবশেষ অবস্থা জানেন কি না, এমন প্রশ্ন করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ইমাম সিরাজউদ্দৌলা। এরপর আর কথা বলতে পারেননি।