হাজারো তরুণীর নেতৃত্ব বিকাশে জাতিসংঘের ‘সি লিডস টুমোরো’

নতুন প্রজন্মের নারী নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাকে উদযাপন করতে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সি লিডস টুমোরো’ শীর্ষক জাতীয় অনুষ্ঠান। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয়, ইউএন উইমেনস ও ইউএনওপিএস বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে রোববার (৯ আগস্ট) মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
‘এনহ্যান্সিং উইমেনস পলিটিক্যাল লিডারশিপ থ্রু এসডিজি ফাইভ অ্যান্ড এসডিজি ১৬ লোকালাইজেশন ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের ন্যাশনাল ডিসেমিনেশন ইভেন্ট হিসেবে এ আয়োজন করা হয়। জয়েন্ট এসডিজি ফান্ডের সহায়তায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এক হাজারেরও বেশি কিশোরী ও তরুণীকে নেতৃত্ব বিকাশ এবং নিজ নিজ সমাজে পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং তরুণ নারী নেতারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রকল্পের বিভিন্ন অর্জন তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. জুবাইদা রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. এস. এম. আবদুল-আওয়াল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. জুবাইদা রহমান তরুণ অংশগ্রহণকারীদের অর্জনের প্রশংসা করেন। তিনি ভবিষ্যত নারী নেতৃত্ব বিকাশে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘তরুণ নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তারা শুধু নিজেদের সম্প্রদায়কেই শক্তিশালী করে না, দেশের ভবিষ্যৎকেও শক্তিশালী করে। আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে তাদের কণ্ঠ, চিন্তা ও নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ অপরিহার্য। আজকের তরুণ নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা মানেই আগামী দিনের জন্য আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।’
অধ্যাপক ড. এস. এম. আবদুল-আওয়াল বলেন, ‘এসডিজি স্থানীয়করণ হলো জাতীয় অঙ্গীকারকে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থবহ কার্যক্রমে রূপ দেওয়া। এই যাত্রায় তরুণ নারীদের সক্রিয় অংশীদার হতে হবে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এমন সিদ্ধান্ত ও সমাধান তৈরির প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা রাখতে হবে।’
বাংলাদেশে জাতিসংঘের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল প্রলার-প্রেজবিনিয়াক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রযাত্রায় কাউকে পিছিয়ে না রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইউএনওপিএস বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধরন। তিনি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা ও সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে তরুণ নারীদের নেতৃত্বে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ইউএন উইমেনস বাংলাদেশের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিং নারী ও কিশোরীদের জন্য এমন একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন, যেখানে তারা নেতৃত্ব দিতে, অংশগ্রহণ করতে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘সি লিডস টুমোরো’ কফি টেবিল বইয়ের প্রকাশনা। প্রধান অতিথি বইটির উদ্বোধন করেন। এতে প্রকল্পে অংশ নেওয়া তরুণীদের সাহস, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের অনুপ্রেরণামূলক গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে ‘সি লিডস টুমোরো’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রকল্পের মাধ্যমে জীবনে পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করা কিশোরী ও তরুণীদের গল্প তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা বিনিময়, গল্প বলার পর্ব, ভিডিও প্রদর্শনী ও ইনক্লুশন সেরিমনি অনুষ্ঠিত হয়। পরে নারীর কূটনৈতিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং লিঙ্গসমতা এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে তিনটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনা হয়।
কিশোরীদের নেতৃত্ব বিকাশ, নাগরিক সম্পৃক্ততা ও অর্থবহ অংশগ্রহণে অবদান রাখার জন্য অংশীদার স্কুলগুলোকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে ১২ মাসব্যাপী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এক হাজারেরও বেশি কিশোরী ও তরুণী এতে অংশ নেয়।
নেতৃত্ব বিকাশ, মেন্টরশিপ, নাগরিক শিক্ষা, নীতি সংলাপ ও অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের নেতৃত্বের সক্ষমতা বিকাশের পাশাপাশি নাগরিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়।
প্রকল্পটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো ‘বাংলাদেশ মডেল ফর এসডিজি লোকালাইজেশন’ তৈরি করা। এটি একটি সম্প্রসারণযোগ্য কাঠামো, যা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সহযোগিতামূলক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে, SDG বাস্তবায়নে স্থানীয় মালিকানা জোরদার করে এবং টেকসই উন্নয়নের প্রচেষ্টায় তরুণ নারীদের নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেয়।
আয়োজকেরা বলেন, ‘সি লিডস টুমোরো’ বাংলাদেশের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণ নারীদের সাহস, দৃঢ়তা ও আকাঙ্ক্ষার উদযাপন।
.png)



