logo
Advertisement

নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে পিরোজপুরের ‘মানচিত্র’

নাছরুল্লাহ আল-কাফী
পিরোজপুর, বরিশাল
নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে পিরোজপুরের ‘মানচিত্র’
চন্ডিপুর ইউনিয়নের খোলপটুয়া গ্রামের পানগুছি নদীর চৌ মোহনার ভাঙ্গন কবলিত এলাকা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নদীভাঙনের কবলে পড়ে প্রতি বছরই বদলে যাচ্ছে পিরোজপুরের নদীর তীরবর্তী এলাকার চিত্র। কঁচা, বলেশ্বর, পানগুছি, সন্ধ্যা ও কালীগঙ্গা নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, আবাদি জমি, সড়কসহ সরকারি নানা স্থাপনা। নদীর করাল গ্রাসে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে একের পর এক পরিবার।

পিরোজপুর জেলার সাতটি উপজেলার প্রায় পুরোটাই নদীবেষ্টিত। অথচ বছরের পর বছর ধরে ভাঙনের শিকার হলেও এখনো টেকসই প্রতিরোধ ব্যবস্থা মেলেনি। নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন লাখো পরিবার। ভিটেমাটি হারিয়ে কারও ঠাঁই হয়েছে আবাসন বা আশ্রয়ণ প্রকল্পে, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছেন অন্য অঞ্চলে। যারা এখনও আছেন তারা প্রতিদিন কতটুকু ভিটেমাটি নদীতে তলিয়ে যাবে—এই দুশ্চিন্তাই রাত পার করেন। গত কয়েক বছরে বর্ষা মৌসুমে তীব্র নদীভাঙনে বেড়িবাঁধ ধসে নদী এসে ঠেকেছে মানুষের বসতবাড়ির আঙিনায়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে নদী তীরবর্তী এলাকার কয়েক হাজার পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছে। অধিকাংশ স্থানে বেড়িবাঁধ না থাকা এবং পুরোনো বাঁধগুলো ভাঙা অবস্থায় পড়ে থাকায় চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন বাসিন্দারা। এ অবস্থায় নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধের পাশাপাশি দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ ও সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জিয়ানগরের খোলপটুয়া গ্রামের বাসিন্দা কাঠমিস্ত্রি মো. মিজান খান বলেন, পাশের মোড়েলগঞ্জের সোলমবাইরা থেকে পথেরহাট হয়ে বলেশ্বর খাল দিয়ে জিয়ানগর পর্যন্ত এলাকার মানুষ ঠিকমতো বসবাস করতে পারছে না। আগে বেড়িবাঁধ ছিল, কিন্তু তা ভেঙে গেছে। যতবারই বাঁধা হয়, ততবারই ভেঙে যায়। এসব ভাঙা বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হয়, ঘরে পানি ওঠে এবং জমি নদীতে তলিয়ে যায়। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের আকুল দাবি—ব্লক দিয়ে যেন টেকসই বেড়িবাঁধ তৈরি করা হয়।

জিয়ানগরের পাড়েরহাট ইউনিয়নের টেংরাখালি গ্রামের অবদা এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
জিয়ানগরের পাড়েরহাট ইউনিয়নের টেংরাখালি গ্রামের অবদা এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কলারন গ্রামের জেলে মো. রাজিব হাওলাদার বলেন, আমাদের একটাই দাবি—এলাকার ভাঙা বেড়িবাঁধ যেন দ্রুত ও টেকসইভাবে নির্মাণ করা হয়, যাতে আমরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারি এবং কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারি। এ জন্য সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

একই এলাকার উত্তর কলারন গ্রামের দিনমজুর ও জেলে মো. মাসুম খান জানান, সন্ন্যাসী খেয়াঘাট থেকে পথেরহাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধটি বলেশ্বর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। কলারন ও গাজীরহাট বাজার এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বেড়িবাঁধ বেশি ভাঙনের মুখে পড়ে। এতে লোকালয় প্লাবিত হয়ে চলাচলে চরম ভোগান্তি তৈরি হয়।

তিনি বলেন, আমরা এলাকাবাসী মিলে কিছু অংশ মেরামত করলেও তা আবার ভেঙে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বারবার এসে মেপে যান, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। বিলের মধ্যে পানি ঢুকে ধানবীজসহ লাখ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কাঁচা চুলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে রান্না করে খাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

চণ্ডীপুর বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী ও পল্লী চিকিৎসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকাটি মূলত বন্যাদুর্গত। পানির চাপে প্রতিবছরই বেড়িবাঁধ ভেঙে ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল ও গাছপালা নদীতে ভেসে যায়। কোনো কোনো বছর বন্যার তীব্রতা এত বেশি থাকে যে মানুষ ভেসে গিয়ে প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটে। জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। বিশেষ করে চণ্ডীপুর, খোলপটুয়া, কলারন ও সন্ন্যাসী এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ এটি কঁচা ও পানগুছি নদীর সংযোগস্থল (চৌমোহনা)। এই মোহনায় পানির তীব্র চাপ থাকে। এ অঞ্চলের মানুষের একমাত্র চাওয়া—ব্লক দিয়ে সড়ক ও বেড়িবাঁধগুলো টেকসইভাবে নির্মাণ করা হোক, যাতে স্থায়ীভাবে ভোগান্তির অবসান ঘটে।

নদীভাঙন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওয়ালিউর রহমান রুবেল জানান, উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প রয়েছে। স্থানীয়দের মাধ্যমে ভাঙনের খবর বা আবেদন পেলে তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো হয় এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। তবে, ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড আমাদেরকে জানিয়েছেন নদী শাসনের জন্য পুরো উপজেলায় ধাপে ধাপে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করবে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের (বাপাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুসাইর হোসেন জানান, জেলায় ৬টি পোল্ডারের অধীনে মোট ৩৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার কিছু অংশ বর্তমানে অরক্ষিত। কোনো স্থানে ভাঙন দেখা দিলে স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) ডিও লেটার সাপেক্ষে তারা জরুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। এছাড়া রাজস্ব খাতের আওতাতেও কিছু কাজ সম্পাদন করা হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, জেলার সন্ধ্যা, বলেশ্বর ও কঁচা নদীর সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ বর্তমানে চলমান। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙন এলাকাগুলো নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। তার ভিত্তিতে একটি ডিপিপি (প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরি করে বোর্ডে পাঠানো হবে এবং অনুমোদন সাপেক্ষে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।