logo

অস্তিত্ব সংকটে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প

মাসুদ কাউছার
টাঙ্গাইল
অস্তিত্ব সংকটে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প
হস্তচালিত তাঁতে কাপড় বুনছেন এক তাঁতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্প একসময় এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল। ঘরে ঘরে তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত গ্রাম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। কম আয়, কাঁচামালের বাড়তি দাম, বাজারে মেশিনে তৈরি কাপড়ের প্রতিযোগিতা এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। ফলে বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশা ছেড়ে বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন তাঁতিরা।

তথ্যমতে, জেলায় টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী ও দেলদুয়ার উপজেলায় তাঁতের শাড়ি উৎপাদনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রায় অধিকাংশ তাঁত মেশিন বন্ধ রয়েছে, আবার অনেকেই বিক্রি করে দিয়েছেন।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থানীয়রা জানান, তাঁত শুধু একটি পেশা নয়, এটি এ অঞ্চলের শত বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। একসময় পরিবারের বড়দের হাত ধরে ছোটরাও শিখত তাঁত বোনা। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতায় এখন ভাটা পড়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কম মজুরি, মেশিনে তৈরি কাপড়ের প্রতিযোগিতা ও বিদেশে রপ্তানি বন্ধ থাকায় অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের কারণে তরুণ প্রজন্ম এ শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মূলত দিনভর তাঁতে বসে যে আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান সময়ে সংসার চালানো কঠিন। তাই কেউ যাচ্ছেন ব্যবসায়, কেউ চাকরিতে, আবার কেউ বেছে নিচ্ছেন অন্য পেশা।

স্থানীয় তাঁতি সুমন বসাক বলেন, সারাদিন পরিশ্রম করে যে আয় হয়, তা দিয়ে বর্তমান সময়ে সংসার চালানো কঠিন। প্রতিদিন মাত্র ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করে পরিবার চালানো সম্ভব নয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই তাঁত পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

দয়াল নামে এক তাঁত শ্রমিক জানান, কর্মচারী সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে। নতুন করে দক্ষ কারিগর তৈরি হচ্ছে না। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে নিজের সন্তানদেরও তাঁত শিল্পে আসতে উৎসাহিত করছেন না তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে এ শিল্পে বিশেষ নজর দেওয়া হলে নতুন প্রজন্ম আবারও তাঁত পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি, সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, ন্যায্যমূল্য এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা গেলে তরুণদের আবারও তাঁত শিল্পে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

টাঙ্গাইলের শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বলেন, এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার তাঁত ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র চারশতে। নতুন প্রজন্মকে এ শিল্পে উদ্বুদ্ধ করতে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তা না হলে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তা জয়দুর রহমান বলেন, তরুণ প্রজন্মকে তাঁতশিল্পে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, তাঁতিদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিতকরণ এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণে সরকার ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

এদিকে টাঙ্গাইলের শাড়ির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে তরুণ প্রজন্মকে প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি বলেন, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়ি জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁত শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তাঁতিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তাঁত শিল্প গতিশীল হবে এবং নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে তাঁত শিল্প তার আগের ঐতিহ্য ফিরে পাবে।