logo

ঝালকাঠি/পুরোনো প্রযুক্তি আর বাড়তি খরচে অস্তিত্ব সংকটে লবণশিল্প

নাঈম হাসান ঈমন
ঝালকাঠি
পুরোনো প্রযুক্তি আর বাড়তি খরচে অস্তিত্ব সংকটে লবণশিল্প
লবন প্যাকেট করছেন শ্রমিকরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একসময়ের ব্যস্ত নদীবন্দর আর কারখানা-শ্রমিকের হাঁকডাকে মুখর ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী লবণশিল্প আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। কক্সবাজার থেকে আসা অপরিশোধিত কাঁচা লবণের বস্তা ঘিরে যেখানে একসময় দিনরাত প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যস্ততা ছিল, সময়ের বিবর্তনে সেই শিল্পে বড় ধস নেমেছে।

পুরোনো প্রযুক্তি, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাড়তি পরিবহন ব্যয়, আধুনিক ব্যাংকিং ঋণের অভাব এবং প্রযুক্তিনির্ভর বহুজাতিক বড় কোম্পানিগুলোর সাথে অসমান প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধেকের বেশি কারখানা।

নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে একসময় ঝালকাঠি জেলা ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। বর্তমানে নিউ ঝালকাঠি সল্ট, এ.আর.এস সল্ট, দি ক্রিসেন্ট সল্ট, লাকী সল্ট, ধানসিঁড়ি সল্ট, শরীফ সল্ট, তাজ সল্ট এবং মনিলাখ সল্ট নামে ৮টি কারখানা কোনোমতে উৎপাদন চালু রেখেছে। বন্ধ হয়ে গেছে মিতালী, নূর, কুমিল্লা, মদিনা, মিনি ও সুরভী সল্টসহ অন্তত ১২টি নামী প্রতিষ্ঠান।

চালু থাকা আটটি মিলের মধ্যে তিনটি আধুনিক পদ্ধতিতে এবং পাঁচটি পুরোনো প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে। এসব কারখানায় মাসে গড়ে এক হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টন এবং বছরে প্রায় ২০ হাজার ৪০০ থেকে ২৬ হাজার ৪০০ টন ভোজ্য ও শিল্প লবণ উৎপাদন হচ্ছে। আটটি মিলে প্রায় এক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার বেশি বিক্রি হয়।

মিল মালিকদের ভাষ্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকঋণ ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন না পাওয়ায় পুরোনো কারখানার আধুনিকায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সময় বেশি লাগছে এবং বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।

ব্রিটিশ আমল থেকে লবণের ব্যবসা

ঝালকাঠির লবণ ব্যবসার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ আমল থেকেই ঝালকাঠি ও আশপাশের অঞ্চলে লবণ ব্যবসা চলছে। নদীপথের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে ঝালকাঠি হয়ে ওঠে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। ঝালকাঠি জেলা একসময় ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ হিসেবে পরিচিত ছিল। নদী ছিল এ ব্যবসার প্রাণ। তবে পুরোনো প্রযুক্তি, তেলের দাম বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক কারখানা।

স্থানীয় মিল মালিকদের অভিযোগ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো ক্রমেই চাপে পড়ছে। এছাড়া চীন, ভারত ও মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা শিল্প লবণ ও বিভিন্ন ধরনের সোডিয়ামভিত্তিক লবণের সঙ্গে দেশীয় কারখানার প্রতিযোগিতা চলছে।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অভিযোগ—বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারায় তাদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম পড়ে। বিপরীতে ছোট কারখানাগুলো পুরোনো প্রযুক্তি, শ্রমনির্ভর উৎপাদন এবং অর্থসংকটের কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।

নৌপ থেকে আসা কাচামাল খারখানায় নেওয়া হচ্ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নৌপ থেকে আসা কাচামাল খারখানায় নেওয়া হচ্ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কাজ কমেছে শ্রমিকদের

লবণের চাহিদা বাড়লেও তার সুফল শ্রমিকদের জীবনে খুব একটা পৌঁছাচ্ছে না। শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোরবানির ঈদে মে মাসে লবণের চাহিদা বাড়লেও শ্রমিকদের আয়-জীবনে তার বড় প্রভাব পড়েনি বলেও শ্রমিকেরা অভিযোগ করেন। ওই সময় চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতে লবণের ব্যবহার বাড়ায় বাজার ও কারখানায় কর্মচাঞ্চল্যও বেড়েছিল।

শ্রমিক আব্দুল লতিফ বলেন, আগে কাজ বেশি ছিল, প্রায় প্রতিদিনই কাজ পাওয়া যেত। এখন কাজ কমে যাওয়ায় সপ্তাহে চার-পাঁচ দিন কাজ করেই থাকতে হয়। এতে সংসারের খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছে।

শ্রমিক রুস্তম আলী বলেন, আগে লবণের মিলে কাজের চাপ অনেক বেশি ছিল। বছরের বেশিরভাগ সময়ই নিয়মিত কাজ পাওয়া যেত। এখন মিল কমে যাওয়ায় কাজের সুযোগও কমেছে। কোনো সপ্তাহে কয়েকদিন কাজ থাকে, আবার কোনো সময় কাজ না থাকায় বসে থাকতে হয়। আয় কমে যাওয়ায় সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরেক শ্রমিক রিপন সিকদার বলেন, আগের তুলনায় কাজ অনেক কমে গেছে। যে টাকা পাই, তা দিয়ে বর্তমানে সংসার চালানো কষ্টকর। আগে নিয়মিত কাজ থাকায় আয়ও মোটামুটি ভালো হতো। এখন কাজ কম থাকায় আয়ও কমে গেছে। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়লেও আমাদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। লবণের মিলগুলো যদি আগের মতো চালু থাকত এবং কাজের সুযোগ বাড়ত, তাহলে আমাদের মতো শ্রমিকদের উপকার হতো।

ঝালকাঠির লবণশিল্পে একসময় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। তবে বর্তমানে প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বর্তমানে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় এক হাজার পরিবারের জীবন-জীবিকা এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন।

শ্রমিকদের অভিযোগ, আগে বছরের অধিকাংশ সময় কারখানায় নিয়মিত কাজ থাকলেও এখন অনেক সময় সপ্তাহে চার-পাঁচ দিনের বেশি কাজ পাওয়া যায় না। লবণ পরিষ্কার, বস্তা বহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানো, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহনের মতো কাজে শ্রমিকেরা যুক্ত থাকেন। কাজের পরিমাণ কমে গেলে সরাসরি কমে যায় তাদের দৈনিক আয়।

জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ে চাপে উদ্যোক্তারা

লবণশিল্পের জন্য কাঁচামাল পরিবহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যগতভাবে নদীপথে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কাঁচা লবণ ঝালকাঠিতে আসত। নদীপথের যোগাযোগ একসময় এই শিল্পের অন্যতম শক্তি ছিল। কিন্তু বর্তমানে পরিবহন ব্যয়, নৌপথের নানা সীমাবদ্ধতা এবং সড়কপথে অতিরিক্ত খরচ—সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয়ের ওপর চাপ পড়ছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

মেসার্স নিউ ঝালকাঠি সল্ট মিল মালিক আবু বক্বর সিদ্দিক বলেন, আগে সনাতন পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন করা হতো। এতে খরচ বেশি পড়ত। বর্তমানে আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধন করায় খরচ কিছুটা কম হয়। কিন্তু বর্তমানে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আবার খরচ বেড়ে গেছে। আমাদের লবণ যে পরিমাণে পরিশোধন করা হয়, তাতে চাহিদা মেটানো সম্ভব। কোনো সমস্যা হয় না। কারও প্রয়োজন হলে আমাদের অর্ডার দিয়ে ৫ থেকে ৭ দিন সময় দিলে ৬ হাজার টনের বেশি লবণ দেওয়া সম্ভব।

আরেক মেসার্স তাজ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মিল মালিক মো. ইলিয়াছ বলেন, বর্তমানে অবস্থা তেমন ভালো না। বেচাকেনা কম। সনাতন পদ্ধতিতে লবণ পরিশোধন করতে খরচ বেশি হয়। তারপর আবার তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কক্সবাজার থেকে লবণ আনতে খরচ বেশি পড়ে। এরপর খুলনা আর ঢাকার চাপে আগের তুলনায় তেমন বিক্রি করতে পারি না।

কম দামে স্থানীয় লবণ, তবু বাজারে চাপ

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, বড় কোম্পানির প্যাকেটজাত লবণ বাজারে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত লবণ তুলনামূলক কম দামে বাজারজাত করা সম্ভব হয়। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় লবণের দাম প্রায় ২৫ টাকা কেজির কাছাকাছি থাকার কথাও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তবে বাজারদর সময়, মান, প্যাকেটজাতকরণ, পরিবহন ও বিক্রয়স্থলভেদে পরিবর্তিত হয়। তাই নির্দিষ্ট একটি দামকে সার্বিক বাজারদর হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।

বস্তায় ভরা হচ্ছে লবণ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বস্তায় ভরা হচ্ছে লবণ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকার দোকানিরা এসে পাইকারি দরে লবণ কিনে নিয়ে যান। বর্তমানে প্রতি কেজি ভোজ্য লবণ পাইকারি বাজারে ১০ টাকা এবং খুচরা বাজারে ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যেখানে উন্নত কোম্পানির প্রতি কেজি ভোজ্য লবণ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত লবণের দাম ক্রেতাদের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকায় এর এখনও বেশ চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশে অনেকগুলো আধুনিক লবণ তৈরির কারখানা হওয়ায় দেশীয় লবণের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বড় মিল মালিকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লবণ উৎপাদনে টিকে থাকতে সরকারি কোনো সুবিধা না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন লবণ কারখানা মালিকেরা।

সহজ শর্তে ঋণের দাবি মিল মালিকদের ও বিসিকের সহযোগিতার আশ্বাস

মিল মালিকদের সবচেয়ে বড় দাবিগুলোর একটি সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ। তাদের বক্তব্য, আধুনিক মেশিন, সেন্ট্রিফিউজ, প্যাকেটজাতকরণ ইউনিট ও অন্যান্য প্রযুক্তি স্থাপন করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। ফলে পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়েই উৎপাদন চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে একই সঙ্গে তিনটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে—উৎপাদন সময় বাড়ছে, শ্রম ব্যয় বাড়ছে এবং পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমছে।

ঝালকাঠি বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, জেলার লবণ কারখানার উদ্যোক্তারা পুরোনো যন্ত্রপাতি ও যানবাহন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সমস্যায় পড়ছেন। শিল্পটি যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য আর্থিক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, লবণের মান বজায় রাখতে নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন করা হয়। সনাতন পদ্ধতির মিলগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। বর্তমানে কারখানাগুলোতে যে পরিমাণে লবণ বাজারজাত করা হয়, তাতে শুধু জেলার চাহিদা নয়, পুরো বরিশাল বিভাগের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।