মোংলাকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলা হবে: নৌপরিবহনমন্ত্রী

মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলে এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক হাব গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বন্দরের নাব্যতা নিশ্চিতকরণ, ড্রেজিং কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনয়ন, জেটি ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মোংলায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় খুলনার হোটেল সিটি ইনে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আয়োজিত ‘অংশীজন সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
মন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরকে দেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে। খুলনা-মোংলা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে পরবর্তী পর্যায়ে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে। এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন রয়েছে। তবে প্রকল্পটি বড় অঙ্কের আর্থিক বিনিয়োগের হওয়ায়, এর সুফল এবং মোংলা বন্দরের রাজস্ব সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
মোংলায় এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, বর্তমানে এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে এককভাবে চট্টগ্রামনির্ভরতা রয়েছে। সেখানে দুটি এফএসআরইউর একটিতে বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেওয়ায় দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মোংলায় এলএনজি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তার সম্মতির পর বিষয়টি নিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা হয়েছে।
তিনি জানান, এফএসআরইউ স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে ইতোমধ্যে মোংলার আকরাম পয়েন্ট পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সেখানে সম্ভাবনা দেখা গেলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই ও হাইড্রোমরফোলজি সমীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।
মোংলা বন্দরের নাব্যতা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নদীর বিভিন্ন অংশে ৭ মিটার, সাড়ে ৬ মিটার এবং কোথাও ২২, ২৫ এমনকি ৩০ মিটার পর্যন্ত গভীরতা পাওয়া গেছে। তবে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচলের জন্য নিরবচ্ছিন্ন নাব্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ড্রাফটের ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিচ্ছি। ১০ মিটার ড্রাফট নিশ্চিত করা গেলে বড় আকৃতির জাহাজ সহজেই মোংলা বন্দরে ভিড়তে পারবে। এ জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিং, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও স্পট ড্রেজিং—যেখানে যা প্রয়োজন, সরকার তা-ই করবে এবং বিষয়টি তাঁর বিশেষ নজরে থাকবে বলে জানান তিনি।
ড্রেজিং কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, নাব্যতা ধরে রাখতে ড্রেজিং খাতে প্রচুর অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ড্রাফট পাওয়া যায় না। এমনকি সঠিকভাবে ড্রেজিং না করেই বিল তুলে নেওয়ার মতো অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে ড্রেজিং কার্যক্রমকে কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে হবে।
একই সঙ্গে বন্দরের নৌপথে নিমজ্জিত পরিত্যক্ত জাহাজ বা 'রেক' অপসারণের বিষয়েও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।
অংশীজন সম্মেলনে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেখানে ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম ধাপের কাজ শুরু করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ওই ধাপে শিল্প ও সেবা খাতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দ্বিতীয় ধাপের কাজ তিন বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে আরও প্রায় ৬০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ওই উদ্যোগের আওতায় মোংলায় অতিরিক্ত দুটি বা তিনটি নতুন জেটি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা। উপযুক্ত নেতৃত্ব ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে এই অঞ্চল দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল। তবে এখন আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই, সময় এসেছে এ অঞ্চলের সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানোর।
তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে উল্লেখ করেন, এই অঞ্চলে তার জন্ম নেওয়া পরম সৌভাগ্যের। তবে বর্তমানে তিনি ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য এবং একজন মন্ত্রী হিসেবে তার মূল দায়িত্ব সমগ্র বাংলাদেশের প্রতি। দেশের যে অঞ্চলেই উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সুষম উন্নয়ন করা হবে।
মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, অবকাঠামো, নাব্যতা, জেটি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা—সবকিছুর সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমেই মোংলা দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা, খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক মনিরুল হাসান বাপ্পি, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা, খুলনা জেলা প্রশাসক মিজ হুরে জান্নাত, খুলনা রেল ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান এবং কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন স্তরের অংশীজনেরা।



