logo

‘আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে’

‘আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে’

‘আমার বাপরে মারিলিছে (মেরে ফেলেছে), আমার আব্বু সবসময় মাততা (কথা বলতে) চাইতা আমার লগে। তারা আমারে ফোন দিতা না, এর লাগি আমার আব্বুর লগে মাততাম পারছি না। আমার আব্বু ঢাকাত থাকতে মাতছিলাম, আমার আব্বু কইলছিলা—দেশে আওয়ার সময় আমার লাগি রং আনবা, কিন্তু আর আনতা পাররা (পারবে) না। আমার আব্বু দুইন্নাই ছাইড়া গেছইনগি। আমার বাপরে যারা মারছে, আমি চাই তারা জেলে যাইত। আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া (না খাইয়ে) মারছে।’

এভাবেই বাবার মৃত্যুর ঘটনায় বিচারের আকুঁতি ও বাবার সঙ্গে শেষ কথা বলার স্মৃতির কথা বলছিল লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পথে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মারা যাওয়া সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমানের পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে আনজুম মাহার।

লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ১২ তরুণের স্বজনদের কান্না থামছেই না। তাদের মধ্যে জগন্নাথপুরে আমিনুর রহমানের একমাত্র শিশু সন্তান আনজুম মাহারের আকুঁতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। আনজুমের আকুঁতি সবার হৃদয়ে নাড়িয়ে দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বাবাকে হারানো নিয়ে আনজুম মাহার বলছে, ‘আমার আব্বুরে আনা খাবাইয়া মারছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও ইউনিয়নের পাইলগাঁও গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হাবিবুর রহমানের চার ছেলে। দুই ছেলে সরকারি চাকরি করেন। এক ছেলে যুক্ত্যরাজ্যে থাকেন। আমিনুর রহমান চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। তিনি দেশে ডিলার ব্যবসা করতেন। এলাকার যুবকরা দলবেঁধে ইউরোপে যাচ্ছেন দেখে তিনিও ইউরোপে যেতে আগ্রহী হন। কিন্ত তার বাবা এবং ভাইয়েরা তাকে দালালের মাধ্যমে যেতে নিষেধ করেন। বৈধভাবে ইউরোপে পাঠানোর জন্য আমিনুরকে কয়েকটি দেশে ভ্রমণ করানো হয়। 

আমিনুর রহমান জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে আলাদা বাসায় বসবাস করতেন। বাবা ও ভাইয়ের নিষেধ অমান্য করে হঠাৎ করে তিনি ইউরোপে যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন। ভাইয়েরা একদিন জানতে পারেন, গ্রিসে যাওয়ার জন্য আমিনুর লিবিয়া পৌঁছেছেন। এরপর গত ঈদের দিন লিবিয়া থেকে বাবার সঙ্গে কথা বলেন আমিনুর রহমান। এরপর বাবা বা ভাইদের সঙ্গে আর কোনো কথা হয়নি। গত ২৭ মার্চ তার মৃত্যুর খবর পান স্বজনরা। 

আমিনুর রহমানের মৃত্যুর পর শিশু আনজুম ও তার মা মুসলিমা বেগম টিয়ারগাঁও গ্রামে মুসলিমা বেগমের মামার বাড়িতে আছেন। আনজুম জগন্নাথপুর পৌর শহরের নার্সারি স্কুলের স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানের শিক্ষার্থী।

আনজুমের বড় চাচা মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের এলাকার অনেক মানুষ সাগরপথে ইউরোপ গেছেন। একেক পরিবারের ৪-৫ জন করেও গেছেন। এসব দেখে আমার ভাই আগ্রহী হলে সচেতন মানুষ হিসেব আমরা তাকে নিষেধ করি। কিন্তু সে আমাদের না জানিয়ে লিবিয়া চলে যায়। 

তিনি বলেন, আমিনুরের এমন মৃত্যুতে তার স্ত্রী মানসিক ও শারিরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমার বৃদ্ধ বাবাও অনেক আঘাত পেয়েছেন। ফুলের মতো আমার ভাতিজি আনজুমের মুখের দিকে চাওয়া যায় না। কি সান্ত্বনা দেব তাকে ও তার মাকে। আমরা চাই দালালদের শাস্তি হোক এবং এভাবে প্রবাস যাত্রা বন্ধ হোক।

আমিনুর রহমানের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, পিতা-মাতার জীবদ্দশায় সন্তানের মৃত্যু যে কত কষ্টকর, যারা সন্তান হারিয়েছেন তারাই কেবল বোঝেন। আমাদের এমন কোনো সংকট ছিল না যে, ছেলে প্রবাসে গিয়ে উন্নতি করবে। বৃদ্ধ বয়সে ছেলে হারানোর বেদনা সহ্য করতে পারছি না। আমি থানায় মামলা করেছি, মানবপাচারকারীদের যেন উপযুক্ত বিচার হয়।

মামলার বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া আমিনুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবার করা মামলাটি তদন্ত করার জন্য সিআইডি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এখন তারাই মামলাটির তদন্ত করবে, হয়তো আগামী সপ্তাহ থেকে তারা কাজ শুরু করবে।

আমিনুর রহমানের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আনজুম মাহা। ছবি: সংগৃহীত

গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার সময় মারা যান অভিবাসন প্রত্যাশী সুনামগঞ্জের ১২ যুবক। পথ হারিয়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে বোটেই তারা প্রাণ হারান। পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

মারা যাওয়া যুবকরা হলেন, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০), জগদল ইউনিয়নের বাসুরী গ্রামের সালিকুর রহমানের ছেলে সুহানুর রহমান এহিয়া (২২), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. তায়েফ মিয়া (২৪)।

জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁও গ্রামের আশিক মিয়ার ছেলে শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২৩), ছিলাউড়া গ্রামের সামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক (২২) ও দুলন মিয়ার ছেলে নাঈম আহমদ (২৪) এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়নের কবিরনগর গ্রামের ফয়েজুর রহমানের ছেলে মো. ফাহিম অভ্র (২০)।

তাদের মৃত্যুর ঘটনায় ৯ মানবপাচারকারীর বিরুদ্ধে মানবপাচার ও অনাহারের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে দিরাই ও জগন্নাথপুর থানায় পৃথক মামলা হয়েছে। ৩০ মার্চ রাতে জগন্নাথপুর থানায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আমিনুর রহমানের বাবা হাবিবুর রহমান। আর দিরাই থানায় চার মানবপাচারকারীর নাম উল্লেখ করে মামলা করেন দিরাইয়ের বাসুরি গ্রামের মারা যাওয়া সোহানুর রহমান এহিয়ার বাবা ছালিকুর রহমান।