logo

আবিরের জার্সি নিয়ে এখনও কাঁদেন মা পারভিন সুলতানা

আবিরের জার্সি নিয়ে এখনও কাঁদেন মা পারভিন সুলতানা

২০২৪ সালের জুলাইয়ের উত্তাল সময়ে অন্যান্য ক্যাম্পাসের মতো রাজপথে নেমে আসেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঘরে বসে থাকতে পারেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপোর্ট স্টাফ আবদুল্লাহ আল আবির (২৩)। ১৯ জুলাই দিনভর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ। এদিন সন্ধ্যায় পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে ১১ ব্যাগ রক্ত দিয়েও বাঁচানো যায়নি। পরদিন ২০ জুলাই হাসপাতালে মারা যান। ২১ জুলাই রাতে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাহেরচর ক্ষুদ্রকাঠী গ্রামে জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। ছেলেকে হারানোর প্রায় দুই বছর হতে চললেও এখনও কান্না থামেনি আবিরের মা পারভিন সুলতানার।

দিন-রাত ছেলের পছন্দের ১১ নাম্বার জার্সি আর ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মধ্যেই আবিরকে খুঁজে বেড়ান তিনি। জার্সির ঘ্রাণ নেন। আন্দোলনে যাওয়ার আগে বিস্কুট আর সাবান কিনে দিয়েছিল আবির। সেগুলো ব্যবহার না করে রেখে দিয়েছেন সযত্নে।

এবারের মতো কষ্টের ঈদ আর আসেনি পারভিন সুলতানার জীবনে। ছেলে আর নেই। তাই তার পছন্দের ফিরনিও রান্না হয়নি বাড়িতে। আবিরকে হারিয়ে দিশেহারা পুরো পরিবার। বাবা মিজানুর রহমান বাচ্চুর আয়ে কোনোমতে সংসার চলছে।

এবারের ঈদুল ফিতরে কেউ আবিরের পরিবারের সদস্যদরে কোনো খোঁজ নেননি বলে জানান শহীদের একমাত্র বোন মারিয়া ইসলাম মৌরি। তিনি বলেন, ‘এখনও কোনো শহীদ পরিবার বিচার পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা চাইলে শহীদ পরিবারগুলোর জন্য অনেক কিছু করতে পারতো। এনসিপিকে নিয়ে আমরা আশাবাদী হলেও তারা কি পারবে, না পারবে তা জানা নেই। তারপরও জুলাই আন্দোলনে তারা সামনে ছিল। তাদের ডাকেই মানুষ সাড়া দিয়েছে। তাদের কাছে আমরা আশাবাদী। কারণ, এখন তাদের অনেকে এমপি হয়েছে। ফলে সরকার ও এনসিপির কাছে আমরা আশাবাদী। আর কোনো মায়ের কোল যেন খালি না হয়। আমার ভাই যে প্রত্যাশা নিয়ে শহীদ হয়েছিল সেই আশা পূরণ হোক। শহীদ পরিবারগুলো যেন বিচার পায়।’

জুলাই অভ্যুত্থানে আবির শহীদ হওয়ার পর তার বাবা এখন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। একটা চাকরির জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছেন বোন মারিয়া ইসলাম মৌরি। তিনি বলেন, ‘ভাই থাকলে আমার চাকরি করা লাগতো না। এখন ভাই নেই, পরিবারের জন্যই একটা চাকরি প্রয়োজন।’

মৌরি বলেন, ‘সরকার চাইলে আমাদের একটা উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিতে পারতো, তাও হয়নি। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। দুই থেকে তিন মাস হয়ে গেল, এখনও এ বিষয়ে কিছু জানি না। অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে শহীদ পরিবারের সদস্যদের চাকরি দিতে পারতো। কেউ কেউ পেলেও অনেকেই পায়নি। অথচ দেশের জন্য তো সবাই জীবন দিয়েছে। এখানেও বৈষম্য।’

আবদুল্লাহ আল আবিরের মা পারভিন সুলতানা বলেন, ‘২০২৪ সালে আবির যখন আন্দোলনে যায় তখন অনেক কান্না করেছি। একমাত্র ছেলেকে আন্দোলনে যেতে নিষেধ করলেও সে বলেছিল, দেশের জন্য আমাকে যেতেই হবে।’

তিনি বলেন, ‘এতো রক্তের বিনিময়ে আজ এই দেশ। আমি সন্তানহারা। একমাত্র ছেলেহারা। আমরা এই হত্যার বিচার চাই। হাজারো পরিবারের সন্তান শহীদ হয়েছে। আমরা যে কদিন দুনিয়াতে আছি সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই। আর কোনো মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়।’

গুলিবিদ্ধ রকিকে চিকিৎসা নিতে হয় গোপনে

বুকে গুলির ক্ষত নিয়ে দিন কাটছে বরিশালের জিয়া সড়ক এলাকার শাহিন হোসেন রকির। ১৯ জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। 

রকি বলেন, ‘ঝুঁকি নিয়ে নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় আন্দোলনে ছিলাম। তখনকার ভিডিওতেই সব স্পষ্ট। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গোপনে বরিশালের একটি বেসরকারি মেডিকেল থেকে অপারেশন করে গুলি বের করা হয়। যেখানে গুলি লেগেছে সেখানে এখনও ব্যাথা। ব্যাথার যন্ত্রণায় রাতে ঘুমানো যায় না। পুলিশের লাঠিচার্জে হাতের লিগামেন্টে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারী কোনো কাজও করতে পারি না।’

bigStoryContent
বরিশালে জুলাই আন্দোলনে আহত শাহিন হোসেন রকি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

অর্থাভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা নিতে পারছেন না জানিয়ে রকি বলেন, ‘আন্দোলনে নিজের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়েও আজ আমি অবহেলিত। এখন নিজের চিকিৎসা আর পরিবারের হাল ধরার চিন্তায় দিন কাটছে।’

রকির আক্ষেপ, ‘যাদের ডাকে আন্দোলন করলাম, গুলিবিদ্ধ হলাম, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগই নেই। ঈদ গেল আমাদের কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। যারা এনসিপি করে তাদের সঙ্গেই উনাদের যোগাযোগ।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাব্বির হোসেন সোহাগ বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে সবার একটাই প্রত্যাশা ছিল, শেখ হাসিনার পতন ঘটবে আর সবাই স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে। এখন হতাহতদের বিষয়টি সামনে আসছে। এটা নিয়ে আমরা বহুবার কথা বলেছি। বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছি। এমনকি ঢাকায় বহুবার যোগাযোগ করেছি।’

bigStoryContent
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাব্বির হোসেন সোহাগ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তিনি বলেন, ‘আহতদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে অন্তবর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরাও এখনও খোঁজ নেয়নি। যারা নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেছেন তাদের উচিত শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। কারণ, এই শহীদের রক্তের বিনিময়েই তারা আজ সংসদে।’