logo

ঝালকাঠিতে ১৬০ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পীরা

ঝালকাঠিতে ১৬০ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পীরা
শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ঝালকাঠিতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ঝালকাঠিতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মাটির প্রতিমায় রং-তুলির আঁচড়, মণ্ডপ সাজানো ও আলোকসজ্জার আয়োজনে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পী ও আয়োজকেরা। তবে উৎসবের এই ব্যস্ততার মধ্যেও আর্থিক সংকটের ছাপ পড়েছে পূজার আয়োজনে। গত বছরের তুলনায় এ বছর জেলায় দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা কমেছে ১০টি। পূজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই এবার আয়োজন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে জানিয়েছে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ঝালকাঠির চার উপজেলায় ১৬০টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছরে এ সংখ্যা ছিল ১৭০টি। এর মধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ৭২টি মণ্ডপে পূজা হবে। গত বছরের তুলনায় এ উপজেলায় একটি মণ্ডপে পূজা হচ্ছে না। নলছিটি উপজেলায় গত বছরের মতো এবারও ২২টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। রাজাপুর উপজেলায় গত বছর ২০টি মণ্ডপে পূজা হলেও এবার হচ্ছে ১৯টিতে। আর কাঁঠালিয়া উপজেলায় গত বছরের ৫৫টি মণ্ডপের পরিবর্তে এবার পূজা হবে ৪৭টিতে। এ উপজেলায় মণ্ডপের সংখ্যা কমেছে আটটি।

জেলায় যেসব মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে, সেখানে চলছে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ। কোথাও প্রতিমার গায়ে রং লাগানো হচ্ছে, কোথাও চলছে সাজসজ্জা ও অলংকরণের প্রস্তুতি। বাঁশ, খড়, মাটি ও সুতলির কাঠামোর ওপর ধাপে ধাপে তৈরি প্রতিমায় শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার অবয়ব।

প্রতিমাশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মণ্ডপে প্রতিমার মাটির কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে রং ও সাজসজ্জার কাজ। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগেই প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে আয়োজকদের কাছে হস্তান্তর করতে চান তারা। তবে প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বাড়লেও সে তুলনায় মজুরি না বাড়ায় প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কারিগরেরা।

প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। উৎসবের দিনগুলোতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে শহর ও গ্রামের মণ্ডপগুলো মুখর হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা আয়োজকদের। তবে ব্যয় সংকোচনের কারণে কোথাও কোথাও আয়োজন পরসির সীমিত রাখা হচ্ছে।

আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দুর্গোৎসবকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা। প্রতিমার শেষ কাজ, মণ্ডপের সাজসজ্জা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে আয়োজন। তবে গত বছরের তুলনায় ১০টি মণ্ডপে পূজা না হওয়ার বিষয়টি উৎসবের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে সব মণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে। এখন প্রতিমায় রং-তুলির শেষ আঁচড় আর মণ্ডপে মণ্ডপে প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় ঝালকাঠির ১৬০টি পূজামণ্ডপ।

পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের ভাষ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সাজানো ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় আয়োজকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার উদ্বেগও পূজার আয়োজন কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

ঝালকাঠি জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অলোক সাহা বলেন, ‘বর্তমানে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিমা তৈরির খরচও আগের তুলনায় বেশি। একটি পূজামণ্ডপে শুধু প্রতিমা তৈরিতেই সর্বনিম্ন ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এর বাইরে মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, পূজার উপকরণসহ আরও নানা খরচ রয়েছে। সব মিলিয়ে অনেকের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করে পূজার আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে এ বছর ১০টি স্থানে পূজা হচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সামাজিক মিলনমেলা। কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক আয়োজককে সীমিত পরিসরে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। আমরা চাই, আর্থিক সংকটের কারণে যেন কারও পূজার আয়োজন বন্ধ হয়ে না যায়।’

দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও মণ্ডপের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কিছু মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

ঝালকাঠির পুলিশ সুপার মেরিন সুলতানা বলেন, ‘জেলায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। পূজার সময় যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেন নির্বিঘ্নে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকবে।’