স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে হামলার শিকার, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী হারালেন অনাগত সন্তান

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের রাজাবাড়ী গ্রামে পূর্ব ধর্ষণ মামলার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলায় দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর গর্ভপাত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় তার স্বামীও গুরুতর আহত হয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিবেশী চান মিয়া, রওসোনারা, রুমানা ও শিমুলসহ ৬-৭ জন মিলে আলী আকবরের (২৬) ওপর হামলা চালান। এ সময় স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে অন্তঃসত্ত্বা আফসানার (১৮) ওপরও হামলা চালিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। বর্তমানে আফসানা বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি স্থানীয় একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী।
আফসানার বাবা মো. শহিদুল ইসলাম জানান, অভিযুক্ত অনিকের শ্বশুর আব্দুল জব্বারের নামে ২০১৪ সালের নভেম্বরে তার বোনের পাঁচ বছর বয়সি শিশুকে ধর্ষণের ঘটনার মামলাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ চলছে। ওই ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, মারধরের খবর পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত দম্পতিকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে ইন্দেরহাট বাজার এলাকায় অনিক ও কাওসারসহ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে পুনরায় তাদের ওপর হামলা চালায়। ঘটনার সময় আমার মেয়ে আমাকে মোবাইল ফোনে জানালে জরুরি সেবা-৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও কোনো সহায়তা পাইনি। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় নেছারাবাদ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে আলী আকবরকে গত তিনদিন চিকিৎসা দেয়া হয় এবং আফসানার অবস্থার অবনতি হওয়ায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
শহিদুল ইসলামের দাবি, হামলাকারীদের নির্যাতনের কারণেই তার মেয়ের গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে আলী আকবর কিছুটা শঙ্কামুক্ত থাকলেও আফসানার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় বিচার ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে নেছারাবাদ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত মামলা গ্রহণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনার একাধিক নারী প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আফসানাকে মারধরের সময় তারা প্রতিবাদ করতে গেলে হামলাকারীরা তাদেরও ভয়ভীতি দেখায়। তারা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ভুক্তভোগী আফসানা মোবাইল ফোনে কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আমি খুব অসুস্থ, ব্লেডিংয়ের সঙ্গে আমার বেবিটা নষ্ট হয়ে গেছে। কথা বলতে পারছি না, আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এ সময় পাশে থাকা তার স্বজন সাহিনুর বেগম বলেন, ‘আফসানা এখন কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। আমরা হামলাকারীদের বিচার চাই এবং তার সুস্থতার জন্য সবার দোয়া কামনা করছি।’
এ বিষয়ে নেছারাবাদ হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, হামলার শিকার হয়ে গত ৪ জুন বিকালে আমাদের এখানে ভর্তি হয়েছিল। ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা ছিল। পরে ৬ জুন বিকেলে হঠাৎ ব্লেডিং শুরু হয় এবং অবস্থার অবনতি হওয়ার কারণে তাকে রেফার্ড করা হয়েছে।
বলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদুর রহমান সাঈদ বলেন, ঘটনার কথা শুনেছি। তবে দুপক্ষের কেউ আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। অনিক বলেন, ‘আমি কাউকে মারিনি। বরং তারা আমার বাবা-মাকে মারধর করেছে। একইভাবে আফসানা ও আলী আকবরকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চান মিয়া ও রওসোনারা।
এ বিষয়ে নেছারাবাদ থানার ওসি মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে থানার পুলিশ পরিদর্শক সঞ্জয় মজুমদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ভুক্তভোগীর বাবা শহিদুল ইসলাম একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। তখন গর্ভপাতের বিষয়টি জানানো হয়নি। চিকিৎসকের সনদ ও প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র নিয়ে এলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের করা ডায়েরিটি আদালতে পাঠানো হয়েছে।’